মাহে রমজান ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র ও ফজিলতপূর্ণ মাস। এই মাস আত্মসংযম, তাকওয়া অর্জন, ইবাদত বৃদ্ধি এবং মানবিক গুণাবলি বিকাশের মাস। রোজা, নামাজ, তিলাওয়াতের পাশাপাশি দান, সদকা ও যাকাত প্রদানের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। কোরআন ও হাদিসে রমজানে দান-সদকার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাকোরআনের আলোকে দানের গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয়, প্রতিটি শীষে একশত দানা থাকে; আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৬১)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে দান করলে তার প্রতিদান বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। রমজান যেহেতু নেক আমলের মাস, তাই এই মাসে দান করলে তার সওয়াব আরও বেশি বৃদ্ধি পায়।
সদকা মানুষের পাপ মোচন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সদকা গুনাহকে নেভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নেভিয়ে দেয়।” (তিরমিজি)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, সদকা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং পাপ থেকে মুক্তির পথ সুগম করে। রমজানে রোজা মানুষকে ধৈর্য ও সহানুভূতি শেখায়, ফলে দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং সদকা প্রদানের প্রবণতা বাড়ে।
যাকাত ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত এবং এটি সম্পদের পবিত্রতা নিশ্চিত করে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন।” (সূরা আত-তাওবা: ১০৩)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং দাতার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। রমজান মাসে যাকাত আদায় করলে তা অধিক সওয়াবের কারণ হয় এবং দরিদ্র মানুষের কষ্ট লাঘব হয়।
হাদিসে রমজানে দানশীলতার বিশেষ গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, আর রমজান মাসে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন।” (সহিহ বুখারি)। এই হাদিস থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, রমজান মাসে দান-সদকা বৃদ্ধি করা সুন্নত এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
রমজানে অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে, অথচ রোজাদারের সওয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না।” (তিরমিজি)। তাই ইফতার বিতরণ, গরিবদের খাদ্য সহায়তা এবং ফিতরা প্রদান—সবই দান ও সদকার অন্তর্ভুক্ত এবং রমজানে এর ফজিলত অনেক বেশি।
এছাড়া যাকাত, সদকা ও ফিতরা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে। ইসলাম সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “যাতে সম্পদ শুধু ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৭)। অর্থাৎ যাকাত ও দানের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।
রমজানে দান-সদকা ও যাকাত প্রদানের আরেকটি বড় ফজিলত হলো আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ। এই মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। দানের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর রহমতের অধিকারী হয় এবং আখিরাতে মহান প্রতিদান লাভ করে। পাশাপাশি এটি মানুষের অন্তরে তাকওয়া, বিনয় ও উদারতা সৃষ্টি করে, যা ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাহে রমজান দান, সদকা ও যাকাত প্রদানের জন্য সর্বোত্তম সময়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে, এই মাসে দান করলে সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, পাপ মোচন হয়, সম্পদ পবিত্র হয় এবং সমাজে সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত রমজান মাসে অধিক পরিমাণে দান, সদকা ও যাকাত আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
-মামুন










