মাহে রমজানে তাহাজ্জুদ সালাত ও আল্লাহর নৈকট্য

মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাস। এই মাসে ফরজ রোজার পাশাপাশি নফল ইবাদতের গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে তাহাজ্জুদ সালাত বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন এক ইবাদত, যা বান্দাকে তার রবের অতি সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। কোরআন ও হাদিসে তাহাজ্জুদের ফজিলত ও গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর; এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত, আশা করা যায় তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৯) এখানে মহান আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ করে তাহাজ্জুদের নির্দেশ দিলেও তা উম্মতের জন্যও অনুপ্রেরণা। অন্য আয়াতে মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করত এবং শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:১৭-১৮) যা তাহাজ্জুদের প্রতি তাদের গভীর মনোযোগের প্রমাণ।

রমজান মাসে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। মুহাম্মদ (সা.) রমজানের শেষ দশকে অধিক ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন এবং রাত জেগে নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তিনি দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন। তাহাজ্জুদ মূলত কিয়ামুল লাইলেরই অংশ, যা ইশার পর ঘুমিয়ে উঠে আদায় করা উত্তম।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত।” (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাহাজ্জুদ ইবাদতের মর্যাদা কত উঁচু। অন্য এক হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রথম আসমানে অবতরণ করে বলেন, “কে আছো আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব; কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?” (সহিহ বুখারি)  রমজানে এই আহ্বান আরও করুণাময় হয়ে ওঠে।

তাহাজ্জুদ বান্দার ইখলাস ও আল্লাহভীতির পরিচায়ক। দিনের বেলায় মানুষ নানা কাজে ব্যস্ত থাকে; কিন্তু গভীর রাতে, যখন অধিকাংশ মানুষ নিদ্রামগ্ন, তখন একান্তে সেজদায় লুটিয়ে পড়া নিঃসন্দেহে বিশেষ আন্তরিকতার নিদর্শন। এটি হৃদয়কে নরম করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। রমজানে রোজার মাধ্যমে আত্মসংযমের যে অনুশীলন হয়, তাহাজ্জুদ সেই সংযমকে আরও শক্তিশালী করে।

তাহাজ্জুদ আদায়ের জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দুই রাকাত দিয়েও শুরু করা যায়। নিয়মিত ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা, শুরুর দিকে স্বল্প রাকাত আদায় করা এবং কোরআন তিলাওয়াতে মনোযোগ দেওয়া এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটি জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। রমজান এই অভ্যাস গড়ে তোলার সেরা সময়, কারণ পরিবেশ থাকে ইবাদতপূর্ণ ও অনুপ্রেরণাময়।

মাহে রমজানে তাহাজ্জুদ কেবল একটি নফল সালাত নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভের সোপান। কোরআনের নির্দেশনা ও হাদিসের অনুপ্রেরণায় আমরা যদি এই ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি, তবে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ অর্জন সম্ভব। রমজানের পবিত্র রাতে তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে কান্নাভেজা দোয়া-ই হতে পারে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

-মামুন