সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে ‘দম’ সিনেমার শুটিং দৃশ্য। মাত্র ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ঘিরেই সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়! জানা গেছে, পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এ সিনেমার শুটিং চলাকালে ধারণ করা ওই ভিডিও প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফাঁস হওয়া দৃশ্যে আফরান নিশো ও পূজা চেরিকে একসঙ্গে দেখা যায়। সিনেমাটির নায়িকা হিসাবে পূজাকে দেখে একদিকে যেমন উচ্ছ্বসিত ভক্তরা, অন্যদিকে শুটিংয়ের ভিডিও ফাঁস হওয়াকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্নও। ধারণ করা সেই দৃশ্য বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় আলোচনা।
প্রযোজনা টিমের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকে। প্রশ্ন তুলছেন, এ ধরনের সেনসিটিভ দৃশ্য কীভাবে বাইরে এলো? নিরাপত্তা তবে কেমন? শুধু এটিই নয়, এ সিনেমার আরও একটি ভিডিও ফাঁস হয়। সেখানে গায়ে হলুদের সাজে দেখা যায় পূজা চেরীকে। এরই মধ্যে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে পূজার লুক তার ভক্ত-অনুরাগীদেরও মন ভরিয়েছে। এ সিনেমাটি আগামী রোজার ঈদ টার্গেট করে নির্মাণ করছেন রেদওয়ান রনি।
এদিকে ঈদের জন্য নির্মিতব্য আরও একটি সিনেমা হচ্ছে ‘সোলজার’। এতে অভিনয় করছেন শাকিব খান। পরিচালনায় রয়েছে সাকিব ফাহাদ। বেশ গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার সঙ্গেই সিনেমার শুটিং হচ্ছিল। তবে সেই নিরাপত্তা ভেদ করে ফাঁস হয়েছে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ একটি শুটিং দৃশ্য। সেটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফাঁস হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ঢাকার গুলশান-১ ডিএসসিসি মার্কেটে সিনেমার একটি দৃশ্য। যেখানে কালো শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত শাকিব খান পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাজার মনিটরিং করছেন। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই ধারণা করছেন, সিনেমায় তিনি হয়তো একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা দেশপ্রেমিক চরিত্রে অভিনয় করছেন।
অন্যদিকে আসন্ন ঈদের আরও একটি সিনেমা ‘মালিক’। এতে আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম জুটি হয়ে অভিনয় করছেন। বেশ গোপনীয়তার সঙ্গেই নির্মাতা সাইফ চন্দন শুটিং করছিলেন। কিন্তু এরপরও শুটিং সেট থেকে আরিফিন শুভর একটি লুক ফাঁস হয়েছে। যেখানে তাকে লম্বা চুল, রক্তমাখা চেহারা এবং কুড়াল হাতে দেখা যায়। বর্তমানে নির্মিত এ সিনেমাগুলো ছাড়াও গত বছরের কুরবানির ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত শাকিব খানের ‘তাণ্ডব’ সিনেমার শুটিং দৃশ্যও ফাঁস হয়। যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ হইচই পড়ে যায়।
একটা সময় সিনেমার শুটিং সেট ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য এক জায়গা। প্রবেশে নিষেধ, কড়া নিরাপত্তা ও মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন প্রায় প্রতিটি ইউনিটেই আছে একাধিক স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কলাকুশলী এবং অনলাইন দর্শক। ফলে খুব সহজেই সেটের ভেতরের মুহূর্ত বাইরে চলে আসে। যা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। অনেক সময় দেখা যায়, একজন সহকারী কিংবা কোনো শিল্পী নিজেই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’ হিসাবে ভিডিও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করছেন।
এমনকি অনেকে সিনেমায় তার চরিত্রের লুক প্রকাশ করে রহস্য সৃষ্টি করছেন। যা সাম্প্রতিক সময়ে একটু বেশিই হচ্ছে এবং তা ভাইরালও হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি একেবারেই অনুচিত। সিনেমা মুক্তির আগেই এভাবে শুটিং দৃশ্য ফাঁস ও শিল্পীর চরিত্রের লুক প্রকাশ হয়ে গেলে, এতে দর্শক আকর্ষণ কমে যায়। ক্ষতির মুখে পড়েন সিনেমাটির প্রযোজক। কিন্তু তবুও কেন এমনটা হচ্ছে? এটি কি নিছক দুর্ঘটনা? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো কৌশলী প্রচারণার আশ্রয় নিচ্ছেন নির্মাতারা।
এ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো নির্মাতা বক্তব্য প্রদান করতে না চাইলেও, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নির্মাতা প্রতিবেদককে জানান, বেশির ভাগ ছবি ও ভিডিও ফাঁস হচ্ছে দুর্ঘটনাজনিত। ইউনিটের ভেতরে এত মানুষ কাজ করেন যে, সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কোনো এক মুহূর্তের অসতর্কতা থেকেই দৃশ্য বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে বড় বাজেটের সিনেমার ক্ষেত্রে কৌতূহল বেশি থাকায় লিক হওয়া কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে নির্মাতারা অনেক সময় বিপাকে পড়েন, কারণ গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আগেই প্রকাশ হয়ে গেলে দর্শকের আগ্রহ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে নির্মাতাদের এ দাবির উলটো যুক্তিও কম নয়। শোবিজ অঙ্গনে কান পাতলে শোনা যায়, কিছু কিছু ভিডিও এবং ছবি লিক আদৌ দুর্ঘটনা নয়, বরং কৌশলী প্রচারণা। সিনেমার মুক্তির আগে যখন কোনো অফিসিয়াল টিজার বা ট্রেলার আসেনি, তখন হঠাৎ করে সেটের একটি দৃশ্য ভাইরাল হওয়া দর্শকের কৌতূহল কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। আলোচনায় আসে সিনেমার নাম, শিল্পীর লুক, গল্পের ধরন। বিনা খরচে পাওয়া যায় প্রচারণা। বিশেষ করে নতুন নির্মাতা বা নতুন মুখের শিল্পীদের ক্ষেত্রে এ ‘অফিসিয়াল নয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃত’ লিক অনেক সময় কার্যকর অস্ত্র হয়ে ওঠে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রচারণার ধরন বদলেছে। একের পর এক সিনেমার শুটিং দৃশ্য ও ছবি ফাঁসকে অনেকেই আগাম প্রচারণা বলেও মনে করছেন। আগে পোস্টার, গান বা ট্রেলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আগাম প্রচার। এখন দর্শক চায় ‘ইনসাইড স্টোরি’, শুটিংয়ের ভেতরের গল্প, সেটের মজার মুহূর্ত। সেই চাহিদাকে মাথায় রেখেই অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নীরবে কিছু ভিডিও ‘লিক’ মেনে নেয়, এমনকি উৎসাহও দেয়। যদিও প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার করেন না, তবুও ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে বিষয়টি অঘোষিত বাস্তবতা। অন্যদিকে শিল্পীদের দৃষ্টিকোণও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিনয়মিল্পী মনে করেন, অনুমতি ছাড়া শুটিংয়ের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়া তাদের কাজের প্রতি অসম্মান। চরিত্রের লুক বা সংলাপ দর্শকের সামনে আগেই এলে অভিনয়ের সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো শিল্পী নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থেকে লিকের অংশ হয়ে ওঠেন, কারণ এতে তাদের ব্যক্তিগত প্রচারও হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এটা কি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, নাকি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নীরব সম্মতি?
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি স্পর্শকাতর। শুটিংয়ের দৃশ্য মূলত প্রযোজকের সম্পত্তি। অনুমতি ছাড়া তা প্রকাশ করা কপিরাইট লঙ্ঘনের শামিল। কিন্তু বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ লিক হওয়া দৃশ্য ইতোমধ্যেই প্রচারণার কাজ করে ফেলেছে, তখন মামলা করে লাভ কী, এ ভাবনাও কাজ করে অনেকের মনে। বিষয়টি এ রকম যে, বিনা পয়সায় সিনেমার প্রচারণা। তবে এ পন্থাকে নীরবে সায় দেওয়া ইন্ডাস্ট্রির জন্য কতটা কল্যাণকর হবে এটিও বিবেচনার বিষয়।
তবে এ ক্ষেত্রে দর্শকের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। লিক হওয়া দৃশ্য দেখার আগ্রহ, শেয়ার করার প্রবণতা নির্মাতাদের এ দ্বিধায় ফেলছে। দর্শক যদি এমন কনটেন্টে সাড়া না দিত, তাহলে লিকের প্রবণতাও কমে যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘এক্সক্লুসিভ’ বা ‘ফাঁস হওয়া’ শব্দটাই মানুষকে আকর্ষণ করে। তাই শুটিংয়ের দৃশ্য লিক হওয়া আজ আশ্চর্য হওয়ার কোনো বিষয় নয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি নিছক দুর্ঘটনা, আবার অনেক ক্ষেত্রেই কৌশলী প্রচারণা। সীমারেখা এতটাই অস্পষ্ট যে, সত্যিটা বোঝা কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, লিক সংস্কৃতি যত বাড়ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে সৃজনশীলতার গোপনীয়তা ও পেশাদারত্ব নিয়ে। ভবিষ্যতে নির্মাতারা যদি সচেতন না হন, তাহলে দুর্ঘটনা আর পরিকল্পিত প্রচারণার এ বিভাজন আরও ধোঁয়াটে হয়ে উঠবে। তখন এ দায় কে নেবে?
মাহমুদ সালেহীন খান










