শোকজ করলে সবার আগে তারেক রহমানকে করা উচিত: এনসিপি

নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শাতে হলে সবার আগে তা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে করা উচিত বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

নির্বাচনের সপ্তাহ তিনেক আগে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা বলেছেন, নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস দিতে হলে সবার আগে তা বিএনপি প্রধানকেই দেওয়া উচিত।

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে এনসিপির দুই নেতা বিএনপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে একের পর এক নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনেন।

একই সঙ্গে তারা অতি দ্রুত তাদের দুই নেতাকে দেওয়া শোকজ তুলে নিয়ে এ বিষয়ে জাতির কাছে ব্যাখ্যা দিতে নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানান।

সোমবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে বিফ্রিংয়ে এনসিপির মুখপাত্র এবং কিছু দিন আগে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা ক্রীড়া ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সবার জন্য ‘নীতি ও নীতিমালা’ একই হওয়া উচিত।

দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি চব্বিশের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন ও তার সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন, বিএনপির আচরণবিধি ভাঙ্গার বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিএনপি চেয়ারম্যানকে কেন কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হল না- সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “তারেক রহমান যখন বাংলাদেশে এসেছেন সারা ঢাকা শহর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। ওনার নির্বাচনি এলাকা গুলশান পোস্টারে ভরে গেছে। অথচ আমাদের গণভোটের প্রচারে ছবি ব্যবহার করায় আমাদের শোকজ দেওয়া হল।”

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুউদ্দীন পাটওয়ারীকে রোববার নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শাতে নোটিস দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী প্রচার শুরু সময় আসার আগেই গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে প্রচারে নামায় তাদের শোকজ করা হয়। সোমবার দুপুরে তারা এর জবাব দিয়েছেন।

এদিন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে এনসিপি। পরে বাংলা মোটরে দলের কার্যালয়ে এ বিষয় ব্রিফিংয়ে আসেন নাহিদ ও আসিফ।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এনসিপির তরফে এসব বিষয় তুলে ধরার কথাও বলেন তারা।

দলের আহ্বায়ক নাহিদের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে অংশ নেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, সেক্রেটারি মনিরা শারমিন এবং আইনি সহায়তাবিষয়ক উপকমিটির প্রধান জহিরুল ইসলাম মূসা।

দেখছি যে সারাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা তাদের দিয়ে দলের নাম দিয়ে তাদের নেতাদের ছবি দিয়ে এবং পোস্টার বিলবোর্ডে এগুলো লাগিয়ে কথা বলছেন। তারা স্পষ্টভাবেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় যে কর্মকর্তারা যারা আছেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা আছেন তারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। নিয়ম ভঙ্গ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা সেখানে আমরা দেখছি না।

“অথচ উদ্দেশ্যভাবে, সম্পূর্ণরূপে নিয়ম মেনে চলার পরেও আমাদের প্রার্থীদেরকে শোকজ করা হচ্ছে। সরকারও গণভোটের প্রচারণা করে হ্যাঁ ভোটের জন্য উৎসাহিত করছে, আমাদের প্রার্থীরাও করছে। সেখানে শুধুমাত্র ছবি ব্যবহারের কারণে শোকজ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন চলা অবস্থায় একটি দলের চেয়ারপারসন যিনি দেশে এসেছেন, আমরা তাকে আমাদের জায়গা থেকে স্বাগতম জানিয়েছিলাম। তখন থেকে সব জায়গায় ওনার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে প্রথমে তাকে সতর্ক করতে হবে, নীতি ও নীতিমালা সবার জন্য সমান হতে হবে। নীতিমালা যদি আলাদাভাবে প্রয়োগ করা হয়…”

এ বিষয়ে নাহিদ বলেন, “নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার প্রশ্ন নিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলতেছি এবং একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে এই বিষয়গুলোকে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে সেই সময় আমাদের এই বিষয়গুলো তো তারা কোনো আমলে নিল না। বরং আমাদেরকেই তারা শোকজ দিল। অর্থাৎ আপনি এই দেশে আইনের কথা মানতে বলবেন। আপনার উপরেই আইনের ভুল প্রয়োগ করা হবে।”

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন আমাকে ওই যে বলা হয়েছে যে আমার ছবি যেহেতু ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে এটা আমি নির্বাচনের প্রচারণা করতেছি। তাহলে এটা বাংলাদেশের আইনে আর কোন আইনে আছে? এটা নির্বাচন কমিশনের বলা উচিত। তাহলে ছবি কে ব্যবহার করতেছে না? তারেক রহমান ঢাকা শহরে পুরা বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক প্রার্থীদের ছবি ব্যবহার হচ্ছে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

“আমাদের সেই বিলবোর্ডে আমরা গণভোটের প্রচারণা করতেছি। সেখানে কোনো মার্কার নাম নেই, কোনো দলের নাম নেই। শুধু একজনের ছবি। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমি গণভোটের পক্ষে বলতেছি যে হ্যাঁ এর পক্ষে।

“এটা বলাটা আমার নৈতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার। এখানে সরকার নিজেই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং প্রচারণা করতেছে।” শোকজ করে গণভোটের প্রচারে নির্বাচন কমিশনই বাধা দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ পরিস্থিতিতে দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় দাবি করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “কিন্তু আমরা চাই যে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক সে জায়গায় আমরা সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করতে চেয়েছি এবং আমরা চেয়েছি যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হোক আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছি।

“বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে ব্যবহার করে শোক সভার নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারণা, নির্বাচন প্রচারণা করা হচ্ছে। কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে এ সবকিছুর মধ্যে দিয়ে তারা কিন্তু প্রচারণা করছে যেটা নির্বাচন কমিশন দেখেও না দেখার ভান করছে। ফলে আইন শুধু একজনের জন্য হবে তার জন্য আবার ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে আইনের ভুল প্রয়োগ হবে আরেকজনের জন্য যেখানে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ আছে কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেই প্রয়োগ করছে না।”

বিএনপি চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, “এখন এই যে একটা স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে চাপ প্রয়োগ করা এটা কি তার পরিকল্পনার অংশ কিনা? এটা কিন্তু জনগণের মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা এটা কি তার পরিকল্পনার অংশ কিনা? এটা কিন্তু জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

“নির্বাচনকে একদিকে হেলে ফেলানো, প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করা, নির্বাচনে যাতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, গণভোটে যাতে ন্যায়ের পক্ষে পড়ে এগুলো তার পরিকল্পনার অংশ কিনা? এটা কিন্তু আমাদের মধ্যে সবার মধ্যে কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

“ফলে জনাব তারেক রহমানের যদি পরিকল্পনা এটা থাকে যে এই নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে হবে না এবং ভোটকেন্দ্র দখল হবে একটা প্রশাসন দলীয়করণ হবে নির্বাচন কমিশনকে চাপ দিয়ে তার নিজের দলের পক্ষে রায় নিয়ে আসবে। তাহলে কিন্তু জনগণ এই জিনিসটা মেনে নেবে না। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এই এই বিষয়টা মেনে নিবে না।

“ফলে আমরা বলব যে বাংলাদেশকে নিয়ে এবং তার পরিকল্পনা এটাও কিনা যে ঋণ খেলাপিদের সংসদে নেবে। দ্বৈত নাগরিকত্ব যাদের রয়েছে তাদেরকে সংসদে নেবে, যারা আবারো ঋণ খেলাপি হবে যারা আবারো টাকা লুট করবে ব্যাংক লুট করবে এবং টাকা পাচার করবে তাদের ভিন্ন দেশে। ফলে তার (তারেক রহমান) পরিকল্পনাটা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।”

নতুন বাংলাদেশ গড়তে এ নির্বাচনে সবাই যার যার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে আশা করে তিনি বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ অবস্থান রাখবে।

 

-মামুন