তিন দশক পর খুনের মামলা: সালমান শাহর স্ত্রীসহ ১১ আসামিদের সম্পদ জব্দের আবেদন

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা বরপুত্র চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। একইসঙ্গে এই মামলার অভিযুক্ত ১১ আসামির স্থাবর সম্পদ জব্দ ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করার জন্য আদালতে আবেদন জানিয়েছে বাদীপক্ষ।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত ছিল। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রমনা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক আতিকুল ইসলাম খন্দকার নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত নতুন এই তারিখ ঘোষণা করেন।
শুনানিকালে বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ মামলার ১১ জন আসামির দেশের ভেতরে থাকা সকল স্থাবর সম্পদ জব্দ এবং অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করার আবেদন জানান। তিনি যুক্তি দেখান যে, মামলার সুষ্ঠু বিচার এবং আসামিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ জরুরি। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নথিভুক্ত করেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তৎকালীন সময়ে তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি দাবি করেন, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান। এরপর সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে সালমানের মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রমনা থানায় ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় করা এই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন— সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লিও ওরফে লুসি, চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, রুবি (মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টার), ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ।
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর এজাহারে উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে সালমানের মা নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী) ও বাবা কমর উদ্দীন সপরিবারে সালমানের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তারা ফোন পেয়ে পুনরায় বাসায় গিয়ে দেখেন সালমান শয়নকক্ষে নিথর পড়ে আছেন। সে সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পা মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামিরার আত্মীয় রুবি বসা ছিলেন।
মামলার এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন সালমানের বাসায় গিয়ে তাকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। সে সময় বাসায় উপস্থিত বহিরাগতদের আচরণ ছিল সন্দেহজনক। এজাহারে আরও বলা হয়, হাসপাতালে নেওয়ার পথে সালমানের গলায় দড়ির স্পষ্ট দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে চিহ্ন দেখা গিয়েছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাদীর দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা দীর্ঘ সময় ধরে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে সিআইডি তাদের প্রতিবেদনে এটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করলেও সালমানের পরিবার এবং ভক্তরা তা কখনোই মেনে নেয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটি নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। সালমানের বাবার মৃত্যুর পর সালমানের মামা আলমগীর তার বোন নীলা চৌধুরীরর পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন। কিন্তু মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।
–লামিয়া আক্তার