ঢাকার উপকণ্ঠে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ ও লাল ইটের নান্দনিক স্থাপনার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যা শুধু শিক্ষা নয়, সংস্কৃতি, গবেষণা এবং জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও খ্যাত। দেশটির একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাজীবন ও আবাসনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। আজ ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ৫৬ বছরে পা দিয়েছে; কিন্তু এর গড়ে ওঠার ইতিহাস ও শিক্ষার গুণমান আজও অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলছে।
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন করা হয়। নামকরণ করা হয়েছিল মোঘল আমলের বাংলার রাজধানী ‘জাহাঙ্গীরনগর’ থেকে এবং প্রাথমিকভাবে এটি পরিচিত ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হওয়ার পর ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। প্রায় ৬৯৭ একর বিস্তৃত ক্যাম্পাসের উত্তরে রয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, উত্তর-পূর্বে সাভার সেনানিবাস, দক্ষিণে বিপিএটিসি এবং পূর্বে কেন্দ্রীয় ডেইরি ফার্ম। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে বয়ে গেছে।
শুরুর দিকে মাত্র চারটি বিভাগ— গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও ভূগোলসহ ১৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এখানে ছয়টি অনুষদ, ৩৪টি বিভাগ এবং চারটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, আইসিটি সেল, মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র ও বিজ্ঞান কারখানা শিক্ষার্থীদের উচ্চমানের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করে। দেশের প্রথম নৃবিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ এবং একমাত্র প্রত্নতত্ত্ব বিভাগও এখানে প্রতিষ্ঠিত। নির্মাণাধীন ছয়তলা আধুনিক গ্রন্থাগার সম্পন্ন হলে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রন্থাগার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। ক্যাম্পাসজুড়ে প্রায় ২৬টি লেক, লাল শাপলা, পদ্ম ও নানা জলজ ফুলে ভরা। প্রতি শীতে সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, ভারত ও জিনজিয়াং অঞ্চল থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরা লেকগুলোকে প্রাণবন্ত করে। পাখি সংরক্ষণে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় পাখি মেলা, বাটারফ্লাই জোনে এবং বার্ষিক প্রজাপতি মেলায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সবচেয়ে উঁচু শহিদ মিনার অবস্থিত। তিনটি স্তম্ভের প্রতিটির নিজস্ব প্রতীক আছে—বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ভূমি ও মানুষ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘সংসপ্তক’ এবং ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত ‘অমর একুশে’ ভাস্কর্য শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও জাতিগত চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চও এখানে অবস্থিত, যা নাট্যকার সেলিম আল দীনের নামে নামকরণ করা। ভরা শীতে এই মঞ্চ হয়ে ওঠে শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করে, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করে।
জাতীয় আন্দোলন ও গণসংগ্রামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সবসময় অগ্রভাগে ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরাই প্রথম ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করেন এবং কারফিউ অমান্য করে রাজপথে নেমে দেশের রাজনীতিতে দৃঢ় ভূমিকা রাখেন।
৫৬ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য খ্যাতিমান কবি, লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার, অর্থনীতিবিদ ও ক্রীড়াবিদের জন্ম দিয়েছে। এখানে পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক বিশেষ শিক্ষাজীবন, যা শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞান নয়, আত্মবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাই আজও এক সবুজ, প্রাণবন্ত শিক্ষার ঠিকানা, যা দেশের শিক্ষাজগৎকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে নতুন উচ্চতায়।
মালিহা










