সাবিনা নাঈম
আপনার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে ৫ হাজার বন্ধু। ইনস্টাগ্রামের স্টোরিতে ভিউ হয় কয়েক শ। হোয়াটসঅ্যাপে গত এক ঘণ্টায় মেসেজ এসেছে ডজনখানেক। অথচ দিনশেষে রাতে যখন ঘুমাতে যান, বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে— ‘কেউ আমাকে বুঝল না!’
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটাই আধুনিক লাইফস্টাইলের সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ সত্য। আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে ‘কানেক্টেড’ বা যুক্ত সময়ে বাস করছি, অথচ আমরাই ইতিহাসের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রজন্ম। এই বিচিত্র একাকিত্ব কোনো রোগ নয়, বরং এটি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার এক বাই-প্রোডাক্ট।
আগেকার দিনে মানুষ বিকেলে পাড়ার মোড়ে আড্ডা দিত, ছাদে কথা বলত। এখন সেই আড্ডা উঠে এসেছে ফেসবুক গ্রুপে; কিন্তু মুশকিল হলো, স্ক্রিনের ওপাশে থাকা মানুষটার ইমোজি আমরা দেখতে পাই, কিন্তু তার চোখের ভাষা বা গলার স্বরের কাঁপুনিটা ধরতে পারি না। ফলে হাজার হাজার মানুষের সাথে ডিজিটাল যোগাযোগ থাকলেও আমাদের অবচেতন মন সেই গভীর মানবিক উষ্ণতা খুঁজে পায় না। আর এখান থেকেই শুরু হয় ‘ক্রনিক লোনলিনেস’ বা দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। একাকিত্বকে এখন অনেকে আর ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখছেন না। বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘সোলো লিভিং’ বা ‘একা যাপনের শিল্প’। তারা একা একা ক্যাফেতে গিয়ে কফি খাচ্ছেন (সোলো ডেট), একা সিনেমা দেখছেন কিংবা একা ট্রাভেলে বেরিয়ে পড়ছেন।
মনোবিদদের মতে, অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের সঙ্গ উপভোগ করাটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পরম প্রাপ্তি। যখন আপনি একা থাকতে ভয় পাবেন না, তখনই আপনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন।
এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর ‘চমকপ্রদ’ কিছু দাওয়াই:
‘আই-কন্টাক্ট’ চ্যালেঞ্জ: রাস্তায় হাঁটার সময় বা দোকানে কেনাকাটার সময় অপরিচিত কারো দিকে তাকিয়ে স্রেফ একটা মৃদু হাসি দিন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্রেফ কয়েক সেকেন্ডের এই মানবিক সংযোগ আপনার মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন (সুখের হরমোন) ক্ষরণ করে, যা কোনো ফেসবুক লাইক দিতে পারে না।
স্মৃতি নয়, মূহূর্ত জমান: স্মার্টফোনের গ্যালারিতে হাজার হাজার ছবি না জমিয়ে সেই মুহূর্তের গন্ধ, শব্দ আর অনুভূতিগুলো মাথায় গেঁথে নিন। কোনো কনসার্টে গিয়ে ফোন উঁচিয়ে ভিডিও না করে চোখ বন্ধ করে গানটা শুনুন। দেখবেন, একাকিত্বের বোধ উবে গিয়ে এক অদ্ভুত পূর্ণতা কাজ করছে।
‘উইকেন্ড কমিউনিটি’ তৈরি করুন: মাসে অন্তত একদিন এমন কিছু করুন যেখানে কোনো স্ক্রিন থাকবে না। হতে পারে সেটা কোনো ভলান্টিয়ারিং কাজ, বই পড়ার ক্লাব কিংবা স্রেফ বন্ধুদের সাথে ইনডোর গেম খেলা। সশরীরে উপস্থিতি একাকিত্বের বিষ নামানোর সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।
একাকিত্বকে বন্ধু বানান: নিঃসঙ্গতা মানে হলো মানুষের অভাব বোধ করা, আর একাকিত্ব মানে হলো নিজের সাথে সময় কাটানোর আনন্দ। প্রতিদিন ১৫ মিনিট স্রেফ নিজের সাথে কথা বলুন। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন— “আজ তুমি কেমন আছ?”
মানুষ আদতে এক সামাজিক জীব। হাজারো রোবোটিক যোগাযোগ আর এআইর ভিড়ে আমাদের আসল ক্ষুধাটা হলো ‘স্পর্শ’ আর ‘অনুভূতি’র। লাইফস্টাইল মানে কেবল আধুনিক গ্যাজেট আর ফ্যাশন নয়, লাইফস্টাইল মানে হলো ভিড়ের মাঝেও নিজেকে হারিয়ে না ফেলা এবং একার সময়েও বিষণ্ণ না হওয়া।
মনে রাখবেন, পৃথিবীটা আপনার ফোনের স্ক্রিনের চেয়েও অনেক বড়। জানালার ওপাশে যে জ্যান্ত পৃথিবীটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, সেখানে আপনি কখনোই একা নন।










