শালীন, শাসন ও শৈলী: ফ্যাশনে ব্যক্তিত্বময় ছিলেন খালেদা জিয়া

২০০১-০৬ বিটিভির দুপুর ২টার সংবাদ খুললেই দেখা যেত সাদা, হালকা সবুজ কিংবা গোলাপি রঙের শিফন শাড়ি পরা বেগম খালেদা জিয়াকে। শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে থাকত শাল আর মুক্তার মালা। গালে হালকা গোলাপি রঙের ব্লাশ। ভারী কিংবা চাকচিক্যময় গয়নার কোনো আধিক্য নেই, খুবই সাধারণ কিন্তু আভিজাত্যময়।দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী ও নজরকাড়া। তার পোশাক, অলংকার ও আচরণ—সব মিলিয়ে তিনি সম্মান, কর্তৃত্ব ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের একটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী কৌশল গড়ে তুলেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার পোশাক মানেই শাড়ি এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বিশেষ করে শিফন শাড়ি তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। হালকা, প্রবহমান শিফনের শাড়ি তিনি বেছে নিতেন এমনভাবে, যাতে আভিজাত্য প্রকাশ পেলেও কোনোরকম বাহুল্য চোখে না পড়ে। সাদা, অফ হোয়াইট, হালকা নীল কিংবা প্যাস্টেল রঙের শাড়িতে তাকে বেশি দেখা গেছে। শাড়ির নকশা ছিল সীমিত, পাড় ও আঁচল পরিমিত—যেন পোশাকের চেয়ে তার উপস্থিতিই হয়ে ওঠে মুখ্য।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল সুস্পষ্ট জাতীয়তাবাদী ধারায়। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে সরকার ও বিরোধী উভয় পর্যায়েই ধর্মভিত্তিক ডানপন্থি শক্তির সঙ্গে জোট গড়তে হয়েছে। এই জোট রাজনীতি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমনি তার ব্যক্তিগত উপস্থাপনার সঙ্গে এক ধরনের বৈপরীত্যও তৈরি করেছে।
যেসব শক্তির সঙ্গে তিনি রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিলেন, তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল; কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত পোশাক, সাজসজ্জা কিংবা প্রকাশ্য উপস্থিতিতে সেই কঠোর রক্ষণশীলতার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি, বরং তার উপস্থাপনা ছিল পরিমিত, মার্জিত এবং বহুমাত্রিক অর্থবহ।
তিনি কখনোই জনসমক্ষে হিজাব বা ধর্মীয় পরিচয়কে জোরালোভাবে তুলে ধরে এমন পোশাকে হাজির হননি। এর পরিবর্তে হালকা রঙের শিফন শাড়ি ছিল তার পরিচিত পোশাক। শাড়ির আঁচল মাথায় রাখা থাকলেও সেটি ছিল নরম ও আলতো ভঙ্গিতে, যা একদিকে শালীনতার প্রকাশ ঘটাত, অন্যদিকে আধুনিক ও অভিজাত নারীর উপস্থিতিও তুলে ধরত। এই উপস্থাপনা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে সম্মান জানালেও নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট রক্ষণশীল কাঠামোয় সীমাবদ্ধ করেনি।
গ্রামে সফরের সময় তার পোশাকে দেখা যেত ভিন্ন এক দৃশ্যপট। তখন শিফনের জায়গা নিত দেশি সুতি বা তাঁতের সাদা শাড়ি। এসব শাড়ির পাড়ে থাকত হালকা রঙের সূক্ষ্ম নকশা—লাল, নীল কিংবা সবুজের পাতলা রেখা। আরামদায়ক, সহজ ও দেশীয় কাপড়ের এই শাড়িগুলো গ্রামীণ বাস্তবতার সঙ্গে ছিল গভীরভাবে সংযুক্ত। অনেকেই মনে করেন, গ্রামবাংলার নারীদের জীবনের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতেই তিনি এমন পোশাক বেছে নিতেন যা ছিল নীরব সামাজিক বার্তার বাহক।
ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিগত রুচি এবং রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোটের মধ্যে এই দ্বৈত অবস্থান তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেনি। বরং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী তাকে নিজের দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছে—কেউ আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, কেউ বা সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নেত্রী হিসেবে।
বাংলাদেশে বিধবা নারীর প্রতি সামাজিক প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে সংযত ও সীমিত উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান এই বিধবা পরিচয়কে কেন্দ্র করে ঘটেছে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি জাতীয় শোক ও স্মৃতির প্রতীক হিসেবে বিশেষ স্থান লাভ করেন।
শুধু খালেদা জিয়ার পোশাককে ব্যক্তিগত রুচি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব সহজেই হারিয়ে যায়। তার ফ্যাশন কাজ করত লিঙ্গ, শ্রেণি, জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়াপথের মিলনস্থলে। এই পোশাকের মাধ্যমে তিনি একযোগে বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ইসলামপন্থী শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ, সংযত হলেও প্রভাবশালী, অভিজাত হলেও জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য।
বেগম খালেদা জিয়া সমাজ কর্তৃক বিধবা নারীদের জন্য নির্ধারিত ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেননি, বরং সেই ভূমিকাকেই পুনর্গঠন করেছেন। এই পুনর্গঠনই জনপরিসরে তার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করেছে। তার পোশাক, আচরণ ও উপস্থিতি একযোগে রাজনৈতিক বার্তা, সামাজিক সংযম এবং নারীর নেতৃত্বের সম্ভাব্য ক্ষেত্রকে সামনে এনেছে।

অলংকারের ক্ষেত্রেও তার রুচি ছিল সুস্পষ্ট। ঝলমলে স্বর্ণালংকার নয়, বরং মুক্তার গয়না ছিল তার প্রথম পছন্দ। মুক্তার হার, কানের দুল কিংবা কখনো ছোট একটি ব্রোচ—এই সীমিত অলংকারেই তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ করতেন। মুক্তার কোমল উজ্জ্বলতা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিও তার প্রতীকে পরিণত হয়।
ঘড়ি ছিল তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দামি বা দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন সরলতা ও ব্যবহারিকতায়। সাধারণত ক্ল্যাসিক ডিজাইনের ঘড়ি—চামড়ার বা ধাতব স্ট্র্যাপসহ—তার হাতে দেখা যেত। সময়নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবেই যেন এই ঘড়ি তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল।
মেকআপ ও সাজেও ছিল একই সংযম। হালকা রুজ, স্বাভাবিক ত্বকের আভা এবং পরিপাটি চুলের স্টাইল সব মিলিয়ে তার উপস্থিতি ছিল মার্জিত ও আত্মবিশ্বাসী। কোথাও অতিরিক্ত কিছু নয়, আবার কোথাও অপূর্ণও নয়। এমন এক সমাজে, যেখানে নারীর নেতৃত্ব প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে এই পরিমিত উপস্থাপনাই তাকে আলাদা করে চেনাতে সাহায্য করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার বড়ো কালো সানগ্লাস, নিজেই একটি রাজনৈতিক চিহ্নে পরিণত হয়েছিল। ‌র‌্যালি, আদালতে উপস্থিতি কিংবা জনসমক্ষে উপস্থিতির সময় এই সানগ্লাস তাকে দিত এক ধরনের দৃঢ় সংকল্প ও রহস্যময়তা। তার এই নিঃশব্দ উপকরণই জনমুখী ও শক্তিশালী নেত্রী হিসাবে ভাবমূর্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া একটি সময়, একটি ধারা, একটি ভঙ্গিমার নাম। তার রাজনৈতিক অবস্থান যেমন শক্তিশালী ও বিতর্কমুখর ছিল, তেমনি তার ব্যক্তিগত রুচি ছিল সংযত, পরিমিত এবং নীরবভাবে অর্থবহ। পোশাক, অলংকার ও সামগ্রিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক দৃশ্যমান ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, যা উচ্চকিত না হয়েও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।

আফরিনা সুলতানা/