জোড়াতালি কাপড়ে প্যাচওয়ার্কের ফ্যাশন

ছোট ছোট রঙিন টুকরা কাপড় একসঙ্গে সেলাই করে জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় প্যাচওয়ার্কের বড় একটি কাপড়। তাতেই তৈরি হচ্ছে শার্ট, স্কার্ট, শাল, এমনকি শাড়ি। একসময় গ্রামবাংলায় ব্যবহৃত অথবা নতুন কাপড় জোড়া দিয়ে সেলাই করে তৈরি করা হতো শীতে গায়ে দেওয়া কাঁথা। প্যাচওয়ার্কে তৈরি পোশাক ও অনুষঙ্গের বিশেষত্ব নজরকাড়া। কৌশলগত কারণে এই মাধ্যমে পোশাক হয়ে ওঠে রঙিন। যেহেতু বেশ কিছু কাপড়ের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়, তাই বিভিন্ন রং এতে দৃশ্যমান হয়। একটির সঙ্গে অন্য কাপড়ের টুকরা জুড়ে দেওয়া হয় সেলাইয়ের মাধ্যমে। তাই সুতার ব্যবহার চোখে পড়ে। বাহারি কাপড়ের টুকরো আর উপযুক্ত সুতার বন্ধনে সম্পন্ন হয় প্যাচওয়ার্ক। এটি বিভিন্ন প্যাটার্নের হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় প্যাচ ব্লক, লগ কেবিন ব্লক, স্টার ব্লক। কাপড় টুকরো করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্যাটার্নের ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন চারকোনা, আয়তাকার, ত্রিভুজ, স্ট্রিপ-শেপড, ডায়মন্ড, হেক্সাগন, ক্লামশেলস। কাপড়ের টুকরাগুলো জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এখানেও দেখা যায় বৈচিত্র্য।
কখনো কাপড়ের সঙ্গে কাপড় জুড়ে, কখনো ফুল-পাখির নকশা সেলাই করে বসিয়ে, আবার কখনো ঝালর বানিয়ে কাপড়ে বসিয়ে নিয়ে করা হয় প্যাচওয়ার্ক। কাজটা সূক্ষ্ম, তাই সময়সাপেক্ষ। মনোযোগী, দক্ষ কারিগরদের দিয়ে করানো হয়। এখন অনেকেই মেশিন ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সারছেন প্যাচওয়ার্ক। কিন্তু হাতে তৈরি করতে গেলে প্রয়োজন মেধা, শ্রম আর সময়। আজকাল শাড়ি, শাল, পায়জামা, মাফলার, বেল্ট ও গয়নায়ও মিলছে প্যাচওয়ার্কের কাজ। এ ছাড়া বিছানার চাদর ও টেবিল ক্লথেও প্যাচওয়ার্ক করতে দেখা যায়।
১৯৬০–এর দশকে হিপ্পি সংস্কৃতির হাত ধরে শক্তপোক্তভাবে ফ্যাশন জগতে ঢুকে পড়ে প্যাচওয়ার্ক। আর এখন তো বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে টুকরা কাপড়ের তৈরি পোশাক। আর সেই প্যাচওয়ার্ক কাপড় দিয়ে তৈরি হয় নানা পোশাক। মিলেনিয়াল থেকে জেন-আলফা—সবার পরনেই দেখা যাচ্ছে নানা রঙের প্যাচওয়ার্কের পোশাক। ‎সাধারণত বর্গ, আয়ত ও ত্রিভুজাকার কাপড়ের টুকরা দিয়ে প্যাচওয়ার্ক করতে দেখা যায়।
তবে প্যাচওয়ার্কের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা ব্যাকরণ নেই। যেকোনো রকমের যেকোনো আকারের কাপড়ের টুকরা দিয়েই করা যায় প্যাচওয়ার্ক। টুকরা কাপড় জোড়া দেওয়ার পর তার ওপর হাতে করা হয় কাঁথা সেলাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পোশাককে টেকসই করতে প্যাচওয়ার্কের অপর পাশে জুড়ে দেওয়া হয় একরঙা কাপড়।
আজকাল পুনর্ব্যবহার ও জিরো ওয়েস্টের ধারণা থেকে মানুষ আবার এই কাপড় জোড়া দেওয়ার ধারায় ফিরছে। যেমন আমরা যারা পোশাক নিয়ে কাজ করি, টুকরা টুকরা অনেক কাপড় বেঁচে যায়। তখন সেই টুকরা কাপড়গুলো জোড়া দিয়ে প্যাচওয়ার্ক করা হয়।’
হরেক রকম নকশা ও রং প্যাচওয়ার্ককে দেয় বোহেমিয়ান এক অনুভূতি। বৈশ্বিক ফ্যাশনে প্যাচওয়ার্কের পোশাকের জন্য ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার জঁ পল গোতিয়ে, বেলজিয়ামের ফ্যাশন ডিজাইনার রাফ সিমন্স এবং জাপানি লেবেল খোকির কাজ বেশ প্রশংসনীয়। ‎‎কাপড়ের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকে ফুটিয়ে তোলা যায় বলে ডিজাইনাররা যেমন প্যাচওয়ার্ক নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন, তেমনি প্যাচওয়ার্ক করা নানা রঙের বাহারি পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন একদল ক্রেতা। এ ছাড়া পরিবেশসচেতন ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় পাকাপোক্ত জায়গা করে নিচ্ছে প্যাচওয়ার্ক।

সাবিনা নাঈম