ক্রিকেট মানচিত্রে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি) কেবল একটি মাঠ নয়, বরং আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের এক বিশাল স্মারক। কিন্তু ২০২৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজের বক্সিং ডে টেস্ট সেই আভিজাত্যে এক গভীর ক্ষত তৈরি করল। মাত্র ১৪২ ওভারে ৩৬ উইকেটের পতন এবং দুই দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে আধুনিক ক্রিকেটের জন্য এক ‘বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এরই প্রেক্ষিতে আইসিসি মেলবোর্নের পিচকে ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং দিয়েছে এবং ভেন্যুর নামের পাশে একটি ডিমেরিট পয়েন্ট যুক্ত করেছে।
২৬ ডিসেম্বর শুরু হওয়া টেস্টের প্রথম দিনেই যেন ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। ইংল্যান্ডের পেসারদের তোপে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। প্রথম দিনেই পড়ে যায় দুই দলের ২০টি উইকেট। দ্বিতীয় দিনেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; অতিরিক্ত বাউন্স এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সিম মুভমেন্টের মুখে দাঁড়িয়ে ব্যাটাররা ছিলেন অসহায়। ম্যাচের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১৪২ ওভার, যেখানে পতন ঘটেছে ৩৬টি উইকেটের। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয় পেলেও, জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে পিচের মান।
ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো তার অফিসিয়াল রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন যে, এই পিচে ব্যাট ও বলের মধ্যে নূন্যতম কোনো ভারসাম্য ছিল না। আইসিসির রেটিং ব্যবস্থায় ‘অসন্তোষজনক’ হলো তৃতীয় ধাপ। এই রেটিং পাওয়ার অর্থ হলো এমসিজি একটি ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়েছে। যদি কোনো মাঠ পাঁচ বছরের মধ্যে মোট ৬টি ডিমেরিট পয়েন্ট পায়, তবে সেই ভেন্যুকে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও এমসিজি গত তিন বছর ‘ভেরি গুড’ রেটিং পেয়েছিল, তবে এবারের এই স্খলন ভেন্যুটির দীর্ঘমেয়াদী সুনামের জন্য বড় হুমকি।
এমসিজির কিউরেটর ম্যাট পেজ এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। তিনি জানিয়েছেন, মেলবোর্নের প্রখর রোদ ও গরমের পূর্বাভাস মাথায় রেখে পিচে ১০ মিলিমিটার ঘাস রেখেছিলেন যাতে তিন দিন পর পিচ ফেটে না যায়। কিন্তু এই কৌশল হিতে বিপরীত হয়েছে। ঘাসের আর্দ্রতা এবং পিচের নিচের শক্ত স্তরের কারণে বল অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। জেমস অলসপ (সিএ-এর ক্রিকেট প্রধান) স্বীকার করেছেন যে, এই পিচ ব্যাট ও বলের সেই চিরচেনা এমসিজি ভারসাম্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) কেবল ইমেজের দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং আর্থিকভাবেও এক বিশাল ধাক্কা খেয়েছে। সাধারণত বক্সিং ডে টেস্টের তৃতীয় ও চতুর্থ দিনে সবচেয়ে বেশি দর্শক সমাগম হয়। আগেভাগে খেলা শেষ হয়ে যাওয়ায় গেট মানি বা টিকিট বিক্রি বাবদ প্রাপ্ত কয়েক মিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হচ্ছে।
সিএ-এর প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গের তথ্যমতে- তৃতীয় ও চতুর্থ দিনের অগ্রিম বিক্রি হওয়া টিকিটের অর্থ ফেরত দিতে হচ্ছে। পাঁচ দিনের বদলে দুই দিনে খেলা শেষ হওয়ায় টিভি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্পনসররা বড় অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সব মিলিয়ে লোকসানের অংক প্রায় ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪ কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত বছরজুড়ে বক্সিং ডে টেস্টের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু দুই দিনে খেলা শেষ হওয়ায় ক্রিকেটপ্রেমীরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। বিশেষ করে যারা দূর-দূরান্ত থেকে খেলা দেখতে মেলবোর্নে এসেছিলেন, তাদের জন্য এটি ছিল চরম হতাশাজনক।
তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আশাবাদী যে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ২০২৬ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বক্সিং ডে এবং ২০২৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ১৫০ বছর পূর্তি টেস্টের আগে তারা মাঠের মান পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মেলবোর্নের এই বিপর্যয় কেবল একটি ম্যাচ হারের গল্প নয়, বরং এটি কিউরেটরদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তির যুগে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত ঘাস রাখা যে অনেক সময় ব্যাকফায়ার করতে পারে, তা এখন প্রমাণিত। আইসিসির এই কড়া অবস্থান ভবিষ্যতে বোর্ডগুলোকে আরও সচেতন করবে। এখন ক্রিকেট বিশ্বের নজর সিডনিতে ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া পঞ্চম টেস্টের দিকে, যেখানে দর্শক ও আয়োজকরা অন্তত একটি পাঁচ দিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের প্রত্যাশা করছেন।
-এম. এইচ. মামুন










