বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে প্রায় সাত মাস হতে চলল। ২০২৫ সালের ২০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে উচ্চগতির ইন্টারনেটের নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ছিল। তবে সাত মাস পার হলেও গ্রাহক সংখ্যার বিচারে এটি এখনও অভিজাত ও সীমিত একটি পর্যায়েই আটকে আছে।
গ্রাহক সংখ্যা ও বাজারের অবস্থা
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে স্টারলিংকের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২ হাজারেরও কম (প্রায় ১,৮৬২ জন)। বর্তমানে ডিসেম্বরের শেষ দিকে এই সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তা আড়াই থেকে তিন হাজারের বেশি নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট গ্রাহকদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই আবাসিক ব্যবহারকারী, আর বাকিরা ব্যবসায়িক বা পরীক্ষামূলক কাজে এই সংযোগ ব্যবহার করছেন।
উচ্চমূল্যই কি প্রধান বাধা?
স্টারলিংক বাংলাদেশে আসার পর থেকেই এর খরচ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্টারলিংকের হার্ডওয়্যার কিটের দাম প্যাকেজভেদে ৪৪ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি প্রায় ৬ হাজার টাকা। সাধারণ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের তুলনায় এই খরচ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এটি এখনো নাগালের বাইরে।
কেন পিছিয়ে স্টারলিংক?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে স্টারলিংকের ধীরগতির বিস্তারের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে: ১. উচ্চ ব্যয়: হার্ডওয়্যার এবং মাসিক চার্জ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় কেবল ধনী পরিবার বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এটি ব্যবহার করছে। ২. ব্রডব্যান্ডের আধিপত্য: ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে অপটিক্যাল ফাইবার ইন্টারনেট অনেক কম দামে এবং উচ্চ গতিতে পাওয়া যায়। ৩. ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: ঘনবসতিপূর্ণ শহরে উম্মুক্ত আকাশ পাওয়া কঠিন, যা স্যাটেলাইট ডিশ স্থাপনের জন্য জরুরি।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
তবে স্টারলিংকের প্রকৃত সাফল্য লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে। যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো অসম্ভব, সেখানে স্টারলিংক ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং গভীর সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন সাধারণ নেটওয়ার্ক অকেজো হয়ে পড়ে, তখন স্টারলিংকই হতে পারে একমাত্র ভরসা।
বিটিআরসির অবস্থান ও ভবিষ্যৎ
বিটিআরসি স্টারলিংককে ১০ বছরের জন্য লাইসেন্স প্রদান করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় রিসেলার হিসেবে স্থানীয় গেটওয়ে এবং গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের কাজ নিয়ে আলোচনা করছে। সরকার আশা করছে, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্টারলিংকের খরচ কমলে এবং এর ব্যবহার বাড়লে দেশের ডিজিটাল বিভাজন দূর হবে।
বাংলাদেশে স্টারলিংকের প্রথম সাত মাস মূলত একটি ‘টেস্ট রান’ বা পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আকাশছোঁয়া দাম এবং সীমিত গ্রাহক সংখ্যা সত্ত্বেও, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযোগহীন মানুষকে ইন্টারনেটের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে স্টারলিংক সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসতে পারে কি না।