রয়টার্স: বর্তমান গ্রহ গঠন তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক অভিনব গ্রহমণ্ডলের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১১৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি লাল বামন নক্ষত্রকে ঘিরে চারটি গ্রহের এই ব্যবস্থা গবেষকদের কৌতূহলের কেন্দ্রে এসেছে, কারণ সবচেয়ে বাইরের গ্রহটি গ্যাসীয় না হয়ে শিলা-গঠিত।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার চিওপস (CHEOPS) মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে গ্রহমণ্ডলটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী Science-এ।
গবেষণায় দেখা গেছে, LHS 1903 নামের একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও ম্লান লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে চারটি গ্রহ ঘুরছে। নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ ভর এবং মাত্র ৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা সম্পন্ন।
চারটি গ্রহের মধ্যে দুটি শিলা-গঠিত এবং দুটি গ্যাসীয়। কিন্তু এদের বিন্যাসই বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। সবচেয়ে ভেতরের গ্রহটি শিলা-গঠিত, তার পরের দুটি গ্যাসীয়, আর একেবারে বাইরের চতুর্থ গ্রহটি যা প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী গ্যাসীয় হওয়ার কথা সেটিও শিলা-গঠিত।
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী থমাস উইলসন বলেন, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নক্ষত্রের কাছে অবস্থিত গ্রহগুলো সাধারণত ছোট ও শিলা-গঠিত হয়, কারণ সেখানে তাপমাত্রা বেশি থাকায় গ্যাস বা বরফ ধরে রাখা কঠিন। অন্যদিকে দূরবর্তী অঞ্চলে গ্যাস ও বরফ বেশি থাকায় সেখানে গ্যাসসমৃদ্ধ বৃহৎ গ্রহ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু এই ব্যবস্থায় গ্যাসীয় গ্রহগুলোর বাইরেও একটি শিলা-গঠিত গ্রহ পাওয়া গেছে, যা তত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উইলসনের ভাষায়, এটি যেন “ভেতর থেকে বাইরে গড়ে ওঠা” একটি গ্রহমণ্ডল। আমাদের সৌরজগতে ভেতরের চারটি গ্রহ শিলা-গঠিত এবং বাইরের চারটি গ্যাসীয়। কিন্তু এই নতুন গ্রহমণ্ডলে সবগুলো গ্রহই নিজ নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি আবর্তন করছে এমনকি সবচেয়ে বাইরের গ্রহটিও সূর্য থেকে বুধের দূরত্বের মাত্র ৪০ শতাংশ দূরত্বে অবস্থান করছে। লাল বামন নক্ষত্রের শক্তি কম হওয়ায় এমন ঘনিষ্ঠ কক্ষপথ অস্বাভাবিক নয়।
শিলা-গঠিত দুটি গ্রহকে ‘সুপার-আর্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থাৎ পৃথিবীর মতো হলেও ভরে দুই থেকে দশ গুণ বড়। আর গ্যাসীয় দুটি গ্রহ ‘মিনি-নেপচুন’ শ্রেণিভুক্ত, যা পৃথিবীর চেয়ে বড় হলেও আমাদের সৌরজগতের নেপচুনের চেয়ে ছোট।
গবেষকদের ধারণা, চারটি গ্রহ একসঙ্গে গঠিত হয়নি। বরং পর্যায়ক্রমে তৈরি হয়েছে, এবং চতুর্থ গ্রহটি গঠনের সময় আশপাশে গ্যাসের পরিমাণ কম ছিল। ফলে এটি গ্যাসীয় আবরণ গঠন করতে পারেনি। বিকল্প ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, হয়তো এটি শুরুতে গ্যাসীয় আবরণসহ জন্মেছিল, কিন্তু কোনো মহাজাগতিক সংঘর্ষে সেই আবরণ হারিয়ে কেবল শিলা-কেন্দ্রটি অবশিষ্ট রয়েছে।
স্কটল্যান্ডের University of St Andrews-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ক্যামেরুন বলেন, পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থাও এক বিশাল সংঘর্ষের ফল বলে মনে করা হয়। তাই এমন সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চতুর্থ গ্রহটি সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার কারণেও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এর ভর পৃথিবীর প্রায় ৫.৮ গুণ এবং তাপমাত্রা প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা পৃথিবীতে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রার কাছাকাছি। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও বাসযোগ্যতার সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
১৯৯০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত সৌরজগতের বাইরে প্রায় ৬,১০০টি বহির্গ্রহ শনাক্ত হয়েছে। তবে এই নতুন আবিষ্কার গ্রহ গঠনের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
সাবরিনা রিমি/










