পরিবর্তিত মাধ্যাকর্ষণে মানবদেহের অভিযোজন নিয়ে গবেষণা করবে নাসা

দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণার লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে NASA’র SpaceX Crew-12 মিশন। এই মিশনে অংশ নেওয়া নির্বাচিত নভোচারীরা মহাকাশের স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে মানবদেহ কীভাবে খাপ খাইয়ে নেয় তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় অংশ নেবেন।

Crew-12 মিশনের ক্রুদের মধ্যে রয়েছেন রোসকসমসের কসমোনট আন্দ্রেই ফেদিয়ায়েভ, নাসার নভোচারী জ্যাক হ্যাথাওয়ে ও জেসিকা মেয়ার, এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) নভোচারী সোফি অ্যাডেনো।

নাসার Human Research Program পরিচালিত এসব গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থানের ফলে মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন, দৃষ্টিশক্তি, স্নায়বিক ভারসাম্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা। এই গবেষণার ফল ভবিষ্যতের চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে।

রক্তপ্রবাহ ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি নিয়ে নতুন গবেষণা

Crew-12 মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো ‘Venous Flow’। এতে দেখা হবে মহাকাশে দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে নভোচারীদের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে কি না। শূন্য মাধ্যাকর্ষণে রক্ত ও শরীরের তরল উপাদান মাথার দিকে সরে যেতে পারে, যা রক্ত সঞ্চালনে পরিবর্তন এনে স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের ফিজিওলজিস্ট ড. জেসন লাইটল বলেন,
“এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা বুঝতে চাই, শরীরের তরল স্থানান্তর কীভাবে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গলে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে নভোচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”

এই গবেষণার অংশ হিসেবে ক্রু সদস্যদের উড্ডয়নের আগে ও পরে এমআরআই, আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা এবং রক্তচাপ মাপা হবে। মহাকাশে অবস্থানকালে তারাই নিজেদের জুগুলার ভেইন-এর আল্ট্রাসাউন্ড ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করবেন, যা পৃথিবীতে ফিরে বিশ্লেষণ করা হবে।

চাঁদে অবতরণ অনুশীলন ও বিভ্রান্তি পরীক্ষা

আরেকটি গবেষণা ‘Manual Piloting’-এ নির্বাচিত ক্রু সদস্যরা মিশনের আগে, চলাকালে ও পরে একাধিকবার ভার্চুয়াল চাঁদে অবতরণের অনুশীলন করবেন। এই পরীক্ষায় তারা চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে একটি ভার্চুয়াল মহাকাশযান অবতরণ করানোর চেষ্টা করবেন যে অঞ্চলেই ভবিষ্যৎ Artemis মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নাসার নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. স্কট উড বলেন, “মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনের সময় নভোচারীরা বিভ্রান্তির শিকার হতে পারেন, যা অবতরণের মতো জটিল কাজকে কঠিন করে তোলে।”

যদিও ভবিষ্যৎ চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানে অবতরণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হবে, তবুও জরুরি পরিস্থিতিতে হাতে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে জানান তিনি।

দৃষ্টিশক্তি ও অবতরণ-পরবর্তী আঘাত নিয়েও গবেষণা

এছাড়াও এই মিশনে Spaceflight Associated Neuro-Ocular Syndrome (SANS) নিয়ে গবেষণা করা হবে, যা মহাকাশে অবস্থানের ফলে চোখ ও দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন ঘটায়। গবেষকরা পরীক্ষা করবেন প্রতিদিন ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে এই সমস্যার উপসর্গ কমে কি না।

পৃথিবীতে ফেরার পর অবতরণের সময় সৃষ্ট ক্ষত বা আঘাত নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। শূন্য মাধ্যাকর্ষণ থেকে হঠাৎ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে ফিরে আসার ফলে আঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব তথ্য ভবিষ্যতে মহাকাশযানের নকশা আরও নিরাপদ করতে সহায়ক হবে।

মানব মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

নাসার Human Research Program দীর্ঘদিন ধরে মানবদেহে মহাকাশ ভ্রমণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, বাণিজ্যিক মিশন এবং Artemis কর্মসূচির মাধ্যমে সংগৃহীত এসব তথ্য ভবিষ্যতে চাঁদ, মঙ্গল ও তার বাইরে মানব অভিযানের পথ সুগম করবে।

Crew-12 মিশনের এই গবেষণাগুলো মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করার পথে এক বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

সূত্র: নাসা

সাবরিনা রিমি/