ঈমান হল ইসলামের বিধান সমুহের মূল ও শাখাসহ সকল বিষয়ে হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বিত নাম। প্রথম দু’টি মূল ও শেষেরটি হ’ল শাখা, যেটা না থাকলে পূর্ণ মুমিন হওয়া যায় না। রাগেব আল-ইছফাহানী বলেন, ঈমানের মূল অর্থ হচ্ছে আত্মার প্রশান্তি এবং ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাওয়া। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, ঈমানের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে স্বীকারোক্তি এবং আত্মার প্রশান্তি। আর সেটা অর্জিত হবে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ ও আমলের মাধ্যমে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা সত্যসহ উপস্থিত হয়েছে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে তারাই তো মুত্তাক্বী, তারা যা চাইবে সব কিছুই আছে তাদের প্রতিপালকের নিকট। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান’ (যুমার ৩৯/৩৩-৩৪)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘এমনিভাবেই আমিই ইব্রাহীমকে আসমান ও যমীনের রাজত্ব অবলোকন করিয়েছি, যাতে সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’ (আন‘আম ৬/৭৫)।
তিনি আরো বলেন, ‘তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না’ (হুজুরাত ৪৯/১৫)।
মুমিন ব্যক্তির বিশ্বাসে কোন সন্দেহের লেশমাত্র থাকে না। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও ঈমান বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। আর যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে’।[5] হাদীছের অর্থ এই নয় যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ে বসে থাকবে। বরং অন্তরে বিশ্বাস, মুখে উচ্চারণ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল দ্বারাই একজন মুমিন হওয়া যাবে, নচেৎ নয়। যা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর দ্বারা বুঝা যায়।
মুখে উচ্চারণ অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহর মুখে স্বীকৃতি প্রদান করা, উচ্চারণ করে পড়া এবং আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা বল, আমরা ঈমান রাখি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তাদের বংশধরের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং মূসা ও ঈসা-কে যা প্রাদান করা হয়েছিল এবং অন্যান্য নবীগণকে তাদের প্রভু হ’তে যা দেয়া হয়েছিল। আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী’ (বাক্বারাহ ২/১৩৬)।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের নিকট এটা আবৃত্তি করা হয় তখন তারা বলে, আমরা এতে ঈমান আনি। এটা আমাদের প্রতিপালক হ’তে আগত সত্য’ (ক্বাছাছ ২৮/৫৩)। তিনি আরো বলেন, ‘বল, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তাতে বিশ্বাস করি’ (শূরা ৪২/১৫)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে সত্যের সাক্ষ্য দেয় তারা ব্যতীত’ (যুখরুফ ৪৩/৮৬)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ এবং এই বিশ্বাসে অবিচল থাকে, তাদের জন্য কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না’ (আহক্বাফ ৪৬/১৩)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘অবশ্যই কোন মুমিন ব্যক্তি যখন পাপ কাজে পতিত হয় তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। অতঃপর সে পাপ থেকে তওবা-ইস্তেগফার করলে অন্তর থেকে দাগটি উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে তার অন্তর মসৃণ উজ্জ্বল হয়ে যায়। কালো দাগ বাড়তে থাকলে (পাপ বাড়লে) তার সম্পূর্ণ অন্তর ঘিরে ফেলে। এ মরীচিকা সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন, ‘না এটা কখনও নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১৪)।
ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা এ মর্মে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মা‘বূদ নেই ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসূল। আর ছালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হ’তে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করল। অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন হক থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত’। উপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত এবং হাদীছ থেকে সুস্পষ্ট হ’ল যে, ঈমান অর্থ অন্তরে বিশ্বাস, মুখে উচ্চারণ ও তদনুযায়ী আমল করা। এই তিনটি বস্ত্তর সমন্বয়েই খাঁটি মুমিন হওয়া যাবে, নচেৎ নয়।
আমল’ আরবী শব্দ। এর বাংলা হলো কাজ। মানুষ কোনো কাজের চিন্তা করলে ঐ কাজের সূচনা হয়। সে কাজের জন্য ইচ্ছা ও চেষ্টা করা হলে তাকে আমল বা কাজ বলা হয়। ভাল কাজ করনেওয়ালার যদি ঈমান থাকে এবং ঐ ভাল কাজটা যদি সুন্নত তরীকায় করা হয় তবে ঐ ভাল কাজকে নেক আমল বলা হবে।
যেমন সূরা আসরে বলা হয়েছে ‘যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে। এখানে সূরা আসরে যে ‘আমল’-এর কথা বলা হয়েছে, এই আমলের অর্থ হলো আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যা যা করতে বলেছেন, সেসব করা আর যা যা নিষেধ করেছেন, সেসব না করাকে বোঝানো হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী’ (বাকারাহ ৮২)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মহাকালের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতিতে আছে। তবে তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়’ (আছর ১-৩)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা মহিলা,আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব’ (নাহল ৯৭)।
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তিনি তাদের ভয়-ভীতি শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন’ (মুজাদালাহ
রাসূল (সাঃ)বলেছেন, ‘ঐ লোকই বুদ্ধিমান, যে তার নাফ্সকে দমন করে এবং যে কোনো কাজ করলে এর ফল আখিরাতে কী পাবে সে হিসাব করেই করে।’ দুনিয়ায় নগদ কী ফল পাবে সে হিসাব করে কাজ করা একেবারেই বোকামি। যদি কেউ আখিরাতের হিসাব করে কাজ করে তাহলে-মিথ্যা কথা বলা, ওজনে কম দেওযা, ঘুষ নেওয়া ইত্যাদি কোনোটাই করতে সে সাহস করবে না।
নিয়তকে খাঁটি করতে হলে খেয়াল রাখতে হবে-আমি যে নেক আমলই করি, তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি (খুশি) ও আখিরাতের সাফল্য লাভের উদ্দেশ্যে করছি কি-না। নিয়ত সহীহ্ হলেই আল্লাহ আমাদের আমল কবুল করবেন ও পুরস্কার দেবেন।
সুরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমল করা। রুকূ-সিজদা আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা, মসজিদের দিকে ছালাতের জন্য রওয়ানা হওয়া, হজ্জ আদায় করা, ছিয়াম পালন করা, আল্লাহর দ্বীন সমুন্নত করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ইত্যাদি যত প্রকার আমল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা করা হয় সবই এর মধ্যে শামিল হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বিনীতভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে (ছালাতে) দন্ডায়মান হও’ (বাক্বারাহ ২/২৩৮)।
ইমাম মুহাম্মাদ হুসাইন আল-আজুর্রী বলেন, ঈমান হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমল করা। সুতরাং যার মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে সে প্রকৃত ঈমানদার। এরপর তিনি বলেন, জেনে রেখ আল্লাহ তোমাদের ও আমাদের উপর রহম করুন! মুসলমানদের আলেমগণ যে কথার উপর অটল আছেন সেটা হ’ল, ঈমানের (অর্থ হচ্ছে) অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল করা সকল সৃষ্টির উপর ওয়াজিব। অতঃপর তিনি বলেন, জেনে রেখ, অন্তরের বিশ্বাস ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না তার সাথে মুখের স্বীকৃতি পাওয়া যাবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমল করবে। সুতরাং যার মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান সেই প্রকৃত ঈমানদার হ’তে পারবে। আর এর উপরেই কুরআন ও হাদীছের দলীল এবং মুসলমান আলেমদের কথা প্রমাণিত রয়েছে।
ইবাদত হলো ঈমান ও আমল পরিপূর্ণ সেতুবন্ধন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের শরিয়তের বিধান সমূহ পরিপূর্ণ ঈমানের সহিত আমল করার তৗফিক দান করুন।
মামুন/










