মুনাফিকী একটি মারাত্মক ব্যাধি। এ ব্যাধি মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মানুষ স্বেচ্ছায় মুনাফিক হয়ে যায় না, বরং তার অজান্তেই এ ব্যাধিতে সে আক্রান্ত হয়। বিশেষতঃ আমলী (কর্মগত) নিফাকের বেলায় একথা খুবই প্রযোজ্য। এর মানে এই নয় যে, মানুষ এর মুকাবিলা না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে এবং নিজেকে এত্থেকে রক্ষা না করে যে এ বিষয়টাকে হেয় জ্ঞান করে তার ভুল ধরবে। কেননা মুনাফিকী মানুষের সব সৎ ও ভাল গুণ ছিনিয়ে নেয়। তাকে সৎ আমল সমূহ থেকে বঞ্চিত করে এবং উন্নত মূল্যবোধগুলো তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। এক পর্যায়ে তাকে সমাজে পরিত্যক্ত পরাভূত মানুষে পরিণত করে। এজন্যই কুরআন মাজীদে
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন- ‘এদের (মুনাফিকদের) মনের মধ্যে রয়েছে মারাত্মক ব্যাধি। অতঃপর (প্রতারণার কারণে) আল্লাহ তা‘আলা এদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মিথ্যাবাদিতার কারণে তাদের জন্য রয়েছে পীড়াদায়ক শাস্তি’ (বাক্বারাহ ২/১০)।
মুনাফিকরা অহংকারী হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এদের (মুনাফিকদের) যখন বলা হয় তোমরা (আল্লাহর রাসূলের কাছে) এসো তাহ’লে আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন এরা অবজ্ঞাভরে মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং তুমি (এও) দেখতে পাবে, তারা অহংকারের সাথে তোমাকে এড়িয়ে চলে’ (মুনাফিকূন ৬৩/৫)।
মুনাফিকদের সখ্যতা ও সম্প্রীতি মুমিনদের সাথে নয় বরং কাফেরদের সাথে লক্ষ্য করা যায়। কাফেরদের সাথে তাদের এই দহরম মহরমের জন্য আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী! তুমি মুনাফিকদের এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক ভয়াবহ আযাব রয়েছে, যারা (দুনিয়ার ফায়েদার জন্য) ঈমানদারদের বদলে কাফেরদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা কি এর দ্বারা এদের কাছ থেকে কোন সম্মান লাভের প্রত্যাশা করে? অথচ যাবতীয় সম্মান আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট’ (নিসা ৪/১৩৮-৩৯)।
হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি জানাযায় হাযির হওয়ার জন্য ওমর (রাঃ)-কে ডাকা হয়। তিনি তাতে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আমি তখন তাঁকে অাঁকড়ে ধরে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন!! আপনি বসুন। কেননা এই মৃত লোকটা ওদের অর্থাৎ মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত। আমার কথা শুনে ওমর (রাঃ) বললেন, তোমাকে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কি তাদের একজন? আমি বললাম, না। অবশ্য আপনার জীবনাবসানের পর আমি আর কাউকে নির্দোষ আখ্যায়িত করব না।[10]
ইবনু আবী মুলাইকা বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর ত্রিশজন ছাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছি যাঁদের প্রত্যেকেই নিজের মাঝে মুনাফিকী থাকার ভয় করতেন। তাঁরা কেউই বলতেন না, আমার ঈমান জিবরীল ও মিকাঈলের তুল্য।
ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ও তাঁদের পরবর্তী আমলের নেককার লোকেরা মুনাফিকীকে প্রচন্ড ভয় করতেন। ‘‘আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি-
১. যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে
২. যখন অঙ্গীকার করে, তা ভঙ্গ করে এবং
৩. আমানতের খেয়ানত করে। ’’ (বুখারী-২৬৮২, মুসলিম ১/২৫)
এমনকি আবুদ্দারদা (রাঃ) ছালাতে তাশাহহুদ শেষে মুনাফিকী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বেশী বেশী করে আল্লাহ পাকের আশ্রয় চাইতেন।
হানযালা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুবকর (রাঃ) আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, হানযালা কেমন আছ? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে । তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আরে তুমি বলছ কি? আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থাকি আর তিনি আমাদের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা যেন সেগুলো চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থেকে চলে আসি আর স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি এবং পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি, তখন আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবুবকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো এমন অবস্থা হয়। তখন আবুবকর (রাঃ) ও আমি রওয়ানা হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট হাযির হ’লাম। আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ), হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সেটা কীভাবে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি এবং আপনি আমাদের নিকট জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা ওগুলো স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। অথচ যখন আপনার নিকট থেকে চলে যাওয়ার পর আমাদের স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি তখন তার অনেক কিছুই ভুলে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যার হাতে আমার জীবন তার শপথ! তোমরা যদি আমার নিকট থাকাকালীন অবস্থায় এবং সর্বদা যিকিররত থাকতে পারতে, তাহ’লে তোমাদের ঘরে-বাইরে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে মুছাফাহা (করমর্দন) করত। কিন্তু হে হানযালা! সময় সময় অবস্থার হেরফের ঘটে’।
মুনাফিকের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কোরাআনে রয়েছে,
‘‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিকৃষ্ট স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য তুমি কখনও কোনো সাহায্যকারী পাবে না|’’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৫)
আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং কাফেরদের জন্য রয়েছে দোজখের আগুন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী আজাব। (সূরা তাওবাহ আয়াত ৬৮)
মুনাফিকরা প্রত্যেকেই দ্বিমুখী আচরণকারী। এক মুখে তারা মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয়। অন্য মুখে কথামালা পাল্টিয়ে তারা কাফিরদের সঙ্গে মিলিত হয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থণা, সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে সব ধরনের নিফাকি থেকে হিফাজত করুন। আল্লাহর বিধানের ওপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন।










