রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত খ্যাতিমান সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছায়ানট কর্তৃপক্ষ ক্লাসসহ সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সব শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। জানা যায়, একদল মানুষ ছায়ানট ভবনের ভিতরে প্রবেশ করে। তারা ভবনের বিভিন্ন তলা লক্ষ্য করে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। তবলা, হারমোনিয়াম, চেয়ার এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অফিসিয়াল নথিপত্রও ধ্বংস করা হয়েছে। কিছু কক্ষে আগুন ধরানো হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ছয়তলা ভবনের নিচতলায় আগুনের চিহ্ন স্পষ্টভাবে রয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত তলাগুলোতে ভাঙাচোরা আসবাবপত্র, বাদ্যযন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পড়ে রয়েছে। ভবনের বাইরে আগুন দেওয়ার ব্যবহৃত সামগ্রীও মিলেছে। তবে পুলিশের ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাত ৩টায় কোনো বিক্ষোভকারী আর ভবনের আশেপাশে দেখা যায়নি।
ধানমন্ডি মডেল থানার ডিউটি অফিসার মিঠুন সিংহ বলেন, “বিক্ষুব্ধ জনতা ধানমন্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট ভবনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে। আমরা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিয়েছি এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে অবস্থান করছেন।”
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণে ফায়ার সার্ভিসও বিলম্বিতভাবে পৌঁছায়। ফলে আগুনের প্রাথমিক ক্ষতি আরও বেড়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জানিয়েছেন, ছায়ানট শুধুমাত্র একটি সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। ধানমন্ডিতে অগ্নিসংযোগের এই ঘটনায় শিক্ষার্থী ও কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, “এ ধরনের হামলা শিক্ষার পরিবেশকে অচল করে দেয়। নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও অনেক সরঞ্জাম ও বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এটি সাংস্কৃতিক মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি।”
ছায়ানটের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন। অনেকেই জানিয়েছেন, “এমন পরিস্থিতিতে ক্লাস নেওয়া বা প্রশিক্ষণ চালানো সম্ভব নয়। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত এই হামলার সঙ্গে যুক্তদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনে।”
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে নিশ্চিত না করা হয়, তবে এমন ঘটনা পুনরায় ঘটতে পারে। তাই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।
ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে কিছু অনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য যুক্ত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা শনাক্ত করা যায়নি।
অপরদিকে, নিরাপত্তা বাহিনী জানাচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে ধানমন্ডি এলাকায় অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনী একত্রে ভবনের নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে কাজ করছে।
সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠান দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও শিক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই হামলার ঘটনায় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, দেশের সাংস্কৃতিক মান-সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সকল ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ও নথিপত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে জনগণ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে, যারা এ ধরনের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে জড়িত তাদেরকে দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অবি/










