বারবার কাঁপছে দেশ, মাসে ৮ বার ভূমিকম্প

চলতি মাসে মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে দেশে আটবার ভূমকম্পন অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার রাতের মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার রাত ১০টা ৫১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে অনুভূত এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৪৬২ কিলোমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে কক্সবাজার এবং এর আশপাশের এলাকায় কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি ছিল। তিনি বলেন, এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১২৯ কিলোমিটার গভীরে।

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই দেশে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। ওই দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২। একই দিন ভোর ৪টা ৩৬ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ ও ৪। ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিটে আবার সিলেট অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা। এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সর্বশেষ গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে আটবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

এর আগে গত ২১ নভেম্বর দেশে অনুভূত একটি ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চল এবং দেশের ভেতরে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ভূত্বকের ভেতরে শক্তি জমা হতে থাকলে তা ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে আংশিকভাবে মুক্ত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমে থাকলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশের অবস্থান ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে হওয়ায় এই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়লেও দেশের প্রস্তুতি এখনও অপর্যাপ্ত। প্রস্তুতি মূলত ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা, নিয়মিত মহড়া এবং ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

-সাইমুন