বাংলাদেশ ব্যাংকে নাটকীয় পরিবর্তন: নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় দিন অতিবাহিত হলো। একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও উপদেষ্টাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা, অন্যদিকে হঠাৎ করেই সরিয়ে দেওয়া হলো গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন দেশের প্রথম ব্যবসায়ী গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে এই নিয়োগের পরপরই নতুন গভর্নরকে নিয়ে শুরু হয়েছে ‘ঋণখেলাপি’ বিতর্কের ঝড়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. মোস্তাকুর রহমান পেশায় একজন সফল চার্টার্ড কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (FCMA) এবং তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা হলেও তার ঋণ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে একসময় ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ ছিল। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে তিনি ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে ১০ বছরের জন্য উক্ত ঋণটি পুনঃতফসিল (Reschedule) করেন। বর্তমান ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করা হলে এবং কিস্তি নিয়মিত থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে আর ‘খেলাপি’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। সেই আইনি মাপকাঠিতে তিনি এখন ঋণখেলাপি না হলেও, দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে তার নৈতিকতা ও নীতিগত সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে আর্থিক খাতে প্রবল বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাঙ্গণ ছিল উত্তাল ও অস্থির। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’ এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী অভিযোগ করে বলেন যে, তারা স্বায়ত্তশাসন চেয়েও বাস্তবে ‘স্বৈরশাসন’ পেয়েছেন এবং দাবি আদায় না হলে ‘কলমবিরতি’র হুঁশিয়ারি দেন। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ একদল বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তার হাতে লাঞ্ছিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একদল সদস্য উপদেষ্টাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ‘মব’ করে জোরপূর্বক তার গাড়িতে তুলে ব্যাংক থেকে বের করে দেন।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিক্ষোভ দানা বাঁধলে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, “পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড লাগবে, কিন্তু আমি জাতির সেবা করতে এসেছি।” তবে সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণ পরেই নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হলে তিনি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ব্যাংক ত্যাগ করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার নিয়োগের প্রধান শর্ত হলো-সব ধরনের ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে কর্ম-সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। ১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএ-র সক্রিয় সদস্য।

প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে তার তিন দশকের করপোরেট ও সুশাসন অভিজ্ঞতার প্রশংসা করা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা আর আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন-সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

লামিয়া আক্তার