হলপাড়া থেকে টিএসসি: সেহরি-ইফতার ঘিরে ঢাবির সর্বত্র উৎসবের আমেজ

 

মুসলিম সংখ্যা-গরিষ্ঠ বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী উৎসবমুখর আমেজ নিয়ে আগমন করে পবিত্র রমজান মাস। সেহরি, ইফতার সবকিছুতেই দেশের সর্বত্র এ আমেজ দেখা যায়। পরিবার থেকে দূরে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে এ আমেজ দেখা যায় ভিন্ন মাত্রায়। ইফতারের সময় হলের মাঠ, মল চত্বর, টিএসসির সবুজ চত্বর কিংবা কার্জন হল এলাকা হয়ে উঠে একেকটি পরিবার; একেকটি ঘর।

প্রথম রোজা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে চোখে পড়ে দলবদ্ধ ইফতারের দৃশ্য। বিকেল গড়াতেই হলপাড়া ও টিএসসি এলাকায় বসে অস্থায়ী ইফতার বাজার। ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি, খেজুর আর রঙিন শরবতের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যেই একজন শিক্ষার্থীর ইফতার সম্পন্ন করা সম্ভব, যা শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির।

রমজান মাসে ইফতার উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইফতার বাজার’ হয়ে ওঠে হলপাড়ার রাস্তাটি। বুধবার(৭ রমজান) বিকেল পাঁচটার দিকে সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিক্রেতারা।

হলপাড়ায় ইফতার বিক্রি করছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “এখানে বসি যাতে পড়াশোনার খরচটা চালাতে পারি। রমজানে বেচাকেনা একটু বেশি হয়, তাই ভালো লাগে।”

ইফতার কিনতে আসা শিক্ষার্থীদের সাথেও কথা হয়। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তুলনামূলক কম দামে ইফতার সামগ্রী কিনতে পারছেন তারা।

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ার) কার্জন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, ১০–১৫ জন শিক্ষার্থী সবুজ ঘাসের ওপর বৃত্তাকারে বসে পত্রিকা বিছিয়ে ইফতার সাজাচ্ছেন। কেউ শরবত বানাচ্ছেন, কেউ খেজুর ভাগ করছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে দোয়া পড়ছেন। আজানের অপেক্ষায় থাকা সেই মুহূর্তে ক্লান্ত মুখেও তৃপ্তির হাসি- যেন এই সামান্য আয়োজনই বড় আনন্দ।

টিএসসির সবুজ চত্বরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের আয়োজনে সাবেক শিক্ষার্থীরাও সানন্দে শরিক হয়েছেন ইফতারে।

এ সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অফ গ্রেটার দাউদকান্দি এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম আলোকিত স্বদেশ বলেন, “আমাদের এই ইফতার আয়োজন শুধু খাবার ভাগাভাগির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করে। আমাদের যারা সাবেক আছেন, তারাও এখানে এসে নিজেদের শিক্ষাজীবনের দিনগুলোকে ফিরে পায়। জুনিয়রদের সঙ্গে এক কাতারে বসে ইফতার করা ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই আয়োজন প্রমাণ করে, ঢাবি একটি পরিবার, যেখানে সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু সম্পর্কের বন্ধন অটুট থাকে।”

একই ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ে মল চত্বর এলাকায়, যেখানে দেখা যায় পুরো মল চত্বর জুড়ে বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে শিক্ষার্থীরা ইফতারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখানে কথা হয় কুড়িগ্রাম থেকে আসা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুরাদ হাসানের সাথে। তিনি বলেন, “বাড়িতে থাকতে কখনো ভাবিনি বন্ধুদের সঙ্গে বসে এভাবে ইফতার করব। এখন মনে হয়, এটাই আমার দ্বিতীয় পরিবার।”

শুধু মল চত্বর, টিএসসির সবুজ চত্বর, কার্জন হল প্রাঙ্গণ, কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে, কলা ভবনের সামনে বটতলা নয়; প্রতিটি হলের মাঠসহ ক্যাম্পাসের প্রায় সব জায়গাতেই বিপুল শিক্ষার্থীর সমবেত ইফতার দেখা গেছে। বিভিন্ন জেলা সংগঠন, বিভাগভিত্তিক গ্রুপ, হলের সংগঠন-বাঁধন, ডিবেটিং ক্লাবসহ নানা প্ল্যাটফর্ম আয়োজন করছে ইফতার মাহফিল।
ক্লাস ও পরীক্ষার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি যেতে না পারায় বন্ধুদের সঙ্গেই পূরণ করছেন পরিবারের অভাব। কারো দায়িত্ব ভাজাপোড়া কেনা, কেউ ফল কাটছেন, কেউ শরবত বানাচ্ছেন—সমষ্টিগত এই আয়োজনেই তৈরি হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

হলে হলে বর্ণিল সাজ

রমজানকে ঘিরে আবাসিক হলগুলোতেও দেখা গেছে বর্ণিল সাজসজ্জা। মঙ্গলবার ইফতারের সরেজমিনে দেখা যায় সূর্যসেন হল, বিজয় একাত্তর হল, জসীমউদ্দীন হল, জিয়াউর রহমান হল, শহীদ ওসমান হাদী হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং হাজী মোহাম্মদ মুহসিন হলের প্রবেশপথে শুভেচ্ছাবার্তা, চাঁদ-তারার আলোকসজ্জা আর ঝলমলে গেট সন্ধ্যা নামতেই উৎসবের আবহ তৈরি করছে।

ছাত্র সংগঠনের গণ ইফতার

ইফতার আয়োজনের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও বিতরণ করছে গণইফতার। প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর হাতে ইফতার তুলে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে। এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। মাস্টারদা সূর্যসেন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, “সূর্যসেন হল বাস্কেটবল কোর্টে (ভাবনা চত্বর) ইনসাফ থেকে দেওয়া ইফতার নিয়ে হলের মাঠে বসে ইফতার করেছি। পরিবারকে মিস করলেও এখানে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে।”

সেহরি: ভোরের আরেক উৎসব

ইফতারের মতো সেহরিতেও দেখা যায় মিলনমেলা। গভীর রাতে হলের কক্ষে বন্ধুরা মিলে রান্না করছেন ডিম-ভাজি, খিচুড়ি বা হালকা খাবার। কেউ দল বেঁধে হল ক্যান্টিনে, কেউ আবার আশপাশের ‘মামা হসেহরি করতে যান। ঘুমজড়ানো চোখে হাসি-আড্ডা আর চায়ের কাপে চুমুক-নতুন দিনের রোজা শুরুর আগে এই ছোট্ট আয়োজন যেন আরেকটি উৎসব।

পরিবার দূরে থাকলেও সম্পর্কের বন্ধন যে দূরে সরে যায় না, বরং নতুন আকারে ফিরে আসে-ঢাবির শিক্ষার্থীদের রমজান তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা-রমজানের এই সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ যেন সারাবছর জুড়ে থাকে।

 

-মোঃ বেলাল হোসেন,ঢাবি