তিন যুগের রেকর্ড চূর্ণ: ৭২ আসন নিয়ে রাজনীতির নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে (১৯৯১-২০২৬) ইসলামপন্থী দলগুলো এবার তাদের শক্তিমত্তার চূড়ান্ত জানান দিয়েছে। দীর্ঘ তিন যুগ পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৭২টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। কেবল আসন সংখ্যাই নয়, প্রাপ্ত ভোটের হারেও তারা আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।
ভোটের মাঠে ইসলামপন্থীদের ‘বিস্ফোরণ’
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে কোনো নির্বাচনেই ইসলামপন্থী দলগুলো সব মিলিয়ে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা সম্মিলিতভাবে ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।
নির্বাচনের বছর
ইসলামপন্থীদের প্রাপ্ত আসন
প্রাপ্ত ভোটের হার
১৯৯১
১৯টি
< ১৫%
২০০১
১৯টি
< ১৫%
২০২৪ (বিতর্কিত)
০টি
২০২৬ (ত্রয়োদশ)
৭২টি
৩৮% +
জামায়াতের একক আধিপত্য
ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এবার ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। ইসির তথ্য মতে, জামায়াত একাই ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এছাড়া তাদের মিত্র দলগুলোর মধ্যে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ০২টি আসন। খেলাফত মজলিস: ০১টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: প্রথমবারের মতো ১টি আসন পেয়েছে চরমোনাই পীরের এই দল (তারা সর্বোচ্চ ২৫৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল)।
জোটবদ্ধ রাজনীতির সুফল
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের অংশ হয়ে ভোট করায় ইসলামপন্থী দলগুলো এই অভাবনীয় ফল পেয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৫ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিও ইসলামপন্থীদের ভোট বাড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান এই উত্থানকে স্থায়ী বলে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, “ইসলামপন্থীদের এবারের উত্থান স্থায়ী মনে হচ্ছে না। অনেক দল তাদের মৌলিক ধর্মীয় এজেন্ডাগুলো আড়ালে রেখে সাধারণ রাজনৈতিক ইস্যু সামনে এনেছিল। এছাড়া আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকায় একটি বড় ‘ভ্যাকুয়াম’ তৈরি হয়েছিল, যার সুবিধা তারা পেয়েছে।”
পেছনের ইতিহাস: ১৯৯১ থেকে ২০০৮
১৯৯১: জামায়াত ১৮টি এবং ইসলামী ঐক্যজোট ১টি আসন পেয়েছিল।
১৯৯৬: আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়া এই নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা মাত্র ৪টি আসন পায় (জামায়াত ৩, ঐক্যজোট ১)।
২০০১: বিএনপি-জামায়াত জোটের জোয়ারে ইসলামপন্থীরা ১৯টি আসন পায় (জামায়াত ১৭, ঐক্যজোট ২)।
২০০৮: এই নির্বাচনে বড় ধস নামে; জামায়াত মাত্র ২টি আসন পায়, আর চরমোনাই পীরের দল ১৬৭ আসনে লড়েও কোনো আসন পায়নি।
আগামীর সংসদ ও ইসলামপন্থী ব্লক
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ গ্রহণের পর সংসদে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলো একটি শক্তিশালী ‘বিরোধী ব্লক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। যেখানে জামায়াত এককভাবে বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকবে, সেখানে অন্যান্য ছোট ইসলামপন্থী দলগুলোও নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে।
লামিয়া আক্তার