নৌকার নীরব ভোটব্যাংক কি বদলে দেবে নির্বাচনের ফলাফল?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন বাস্তবতায় রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় এবারের ব্যালটে থাকছে না চিরচেনা ‘নৌকা’ প্রতীক। এমন পরিস্থিতিতে দলটির বিশালসংখ্যক কর্মী-সমর্থক ও ভোটার শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি-না, আর গেলেও তাদের ভোট কোন বাক্সে পড়বে- তা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ।

২০২৫ সালের মে মাসে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর থেকেই দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় দলটির স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে অন্য দলের ওপর ভর করছেন। এমনকি মাদারীপুরের শিবচরের মতো এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের ধানের শীষের পক্ষে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে, যা এক সময় কল্পনা করাও কঠিন ছিল। সাবেক সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ নিজ অস্তিত্ব রক্ষায় অনুসারীদের ভিন্ন মার্কায় ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও তাদের বেশ কয়েকজন সমর্থকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারে নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য ভিন্ন কিন্তু কঠিন বাস্তবতা সামনে এসেছে। কারণ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক নেতাকর্মীরা সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেরিয়েছেন; কিন্তু নির্বাচন সন্নিকটে আসায় অনেক নেতাকর্মী বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। অনেকে জীবনের নিরাপত্তায় ভিন্ন দলের হয়ে ভোট চাইছেন। এমন একটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটে ভোলা-২ আসনে (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান)। জানা গেছে, সেখানে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিমের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ ভয় থেকে, আবার কেউ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে এমন অবস্থান নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের (অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) যে ভোটব্যাংক রয়েছে, তা নিজেদের দিকে টানতে এবার কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের মতো দলগুলো। গত জানুয়ারি মাস থেকে বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের কণ্ঠে আওয়ামী সমর্থকদের প্রতি সুর নরম করতে দেখা গেছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের ৬০ শতাংশ ভোট দিতেই যাবে না। বাকিদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ বিএনপিকে এবং ১৫ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দেবেন। যারা ভিন্ন মার্কায় ভোট দেবেন এর পেছনে তাদের কঠিন বাস্তবতা, সামাজিক দায়, জীবনের নিরাপত্তা কাজ করবে।

ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিপদগ্রস্ত সমর্থকদের পাশে তারা দাঁড়িয়েছেন। চাঁদপুরে এহসানুল হক মিলন ভোটারদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরও আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের হয়রানি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক জায়গা থেকে নয়, বরং নির্বাচনি বৈতরণী পার হতেই এই ‘সহানুভূতি’ দেখানো হচ্ছে।
আলোকিত স্বদেশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে এখন ত্রিমুখী চাপ কাজ করছে। একদিকে দলের নিবন্ধন নেই, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ দলগুলোর ভোট দেওয়ার আহ্বান এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন চাপ। গোপালগঞ্জের এক সাধারণ ভোটার জানান, ভোট দিতে না গেলে বা গেলেÑ উভয় ক্ষেত্রেই সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের ভয় রয়েছে।

কট্টর সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পক্ষে। তাদের মতে, প্রতীকহীন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেয়ে ঘরে থাকাই নিরাপদ। এছাড়া কেন্দ্র দখল বা সংঘাতের আশঙ্কাও তাদের মধ্যে কাজ করছে। অতীতের ভোটের পরিসংখ্যান যা বলছে: নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট প্রাপ্তির হার ছিল উল্লেখযোগ্য: ১৯৯১ সালে ৩০ দশমিক ১ শতাংশ।

১৯৯৬ সাথে ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০০১ সালে ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০০৮ সালে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এই বিশাল ভোটব্যাংক এবার যদি ভোটকেন্দ্রে না আসে, তবে নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতির হারে বড় প্রভাব পড়তে পারে। আর যদি তারা চাপে পড়ে বা নিরাপত্তার স্বার্থে ভোট দিতে যায়, তবে সেই ভোট কোন দিকে যাবেÑ সেটাই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রহস্য।

-মামুন