ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জাকারপাত্তিয়া অঞ্চল-স্কি রিসোর্ট ও পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুদাপেস্ট ও কিয়েভের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে এক লাখেরও বেশি জাতিগত হাঙ্গেরীয় বসবাস করেন। খবর বিবিসির।
অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, চেকোস্লোভাক ও সোভিয়েত শাসন অতিক্রম করে স্বাধীন ইউক্রেনের অংশ হওয়া এই অঞ্চলের ইতিহাস জটিল। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও রোমানিয়ার সীমান্তঘেঁষা এই এলাকা কিয়েভের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে বুদাপেস্টের অভিযোগ, জাকারপাত্তিয়ায় হাঙ্গেরীয় সংখ্যালঘুদের ভাষা ও শিক্ষার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই এই বিরোধ ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাষা আইন ঘিরে বিতর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ইউক্রেনীয় ভাষার ব্যবহার জোরদার করতে উদ্যোগ নেয়। ২০১৭ সালে পাস হওয়া শিক্ষা আইনে প্রাথমিক স্তরের পর ইউক্রেনীয় ভাষাকে প্রধান শিক্ষার মাধ্যম করা হয়, ফলে সংখ্যালঘু ভাষার-বিশেষ করে হাঙ্গেরীয় ভাষার-ভূমিকা সীমিত হয়। এ নিয়ে হাঙ্গেরি প্রতিবাদ জানায় এবং ইউরোপ কাউন্সিলের ভেনিস কমিশনও সমালোচনা করে। ২০১৯ সালের রাষ্ট্রভাষা আইন এবং ২০২৩ সালে ইইউ-অভিগমন আলোচনার সময় আনা সংশোধনীগুলোও পুরোপুরি বিরোধ মেটাতে পারেনি। হাঙ্গেরির দাবি, প্রাথমিকের পর সংখ্যালঘু ভাষায় শিক্ষার সুযোগ এখনও সীমিত।
তবে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় স্টাডিজ বিভাগের গবেষক ড. ক্রিস্টিনা লায়োসি-মুরের মতে, ২০২২ সালের পর থেকে বিষয়টি আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, সংখ্যালঘু অধিকার এখন বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, হাঙ্গেরি কূটনৈতিক সমঝোতার বদলে ইইউতে ইউক্রেনের অগ্রগতিতে ভেটো দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান যুদ্ধ ইস্যুকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যবহার করছেন।
মাটির বাস্তবতা ভিন্ন
অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। উঝহোরোদ শহরের এক ১৭ বছর বয়সী হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী বলেন, তিনি অনায়াসে ইউক্রেনীয় ও হাঙ্গেরীয়-দুই ভাষাতেই কথা বলেন। “আমার হাঙ্গেরিতে বন্ধু আছে, ইউক্রেনেও আছে। কখনও সমস্যা হয়নি,” বলেন তিনি। জাকারপাত্তিয়ায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে হাঙ্গেরীয় ভাষায় শিক্ষা পুরোপুরি অনুমোদিত। মাধ্যমিক স্তর থেকে ইউক্রেনীয় ভাষা প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে হাঙ্গেরীয় ভাষা বিষয় হিসেবে পড়ানো হয় এবং কিছু ক্লাসে সীমিতভাবে ব্যবহার করা যায়। আরেক শিক্ষার্থী জানান, রাজনৈতিক উত্তেজনা সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলেনি। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর স্থানীয়রা বরং নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে এখানে আশ্রয় নিতে আসা মানুষের চাপ সামলাতেই বেশি মনোযোগী।
ভূরাজনীতি ও সংখ্যালঘু প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, বুদাপেস্ট যদি সত্যিই সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় আগ্রহী হয়, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান সংখ্যালঘু সুরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান খোঁজা উচিত। একই সঙ্গে কিয়েভকেও সংখ্যালঘু সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে হবে।যুদ্ধকালীন ভূরাজনীতির টানাপোড়েনের মাঝেও জাকারপাত্তিয়ায় দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক থাকলেও, হাঙ্গেরীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নটি ইউক্রেন-হাঙ্গেরি সম্পর্ক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়ে গেছে।
-বেলাল










