যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, কুখ্যাত অর্থলগ্নিকার জেফ্রি এপস্টিন তার বিরুদ্ধে কিশোরীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে এক প্রভাবশালী মিডিয়া ধনকুবেরের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। খবর আলজাজিরার।
নথিতে দেখা যায়, কানাডীয়-আমেরিকান বিলিয়নিয়ার মর্টিমার জুকারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক ব্যবহার করে এপস্টিন নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ পত্রিকার প্রতিবেদনের ধারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ককে দেহব্যবসায়ে প্রলুব্ধ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সংবাদমাধ্যমে যেভাবে প্রকাশিত হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এপস্টিনের লক্ষ্য। নথি অনুযায়ী, এপস্টিন জুকারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর ডেইলি নিউজ প্রথমে অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বিলম্বিত করে এবং পরে এপস্টিনের অনুরোধ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বাদ দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। ২০০৯ সালের ৯ অক্টোবরের এক ইমেইলে এপস্টিন ডেইলি নিউজের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত করা একটি “প্রস্তাবিত উত্তর” জুকারম্যানকে পাঠান। ওই উত্তরে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। বর্তমানে ম্যাক্সওয়েল শিশু পাচারের দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সাবেক ডেইলি নিউজ সাংবাদিক জর্জ রাশ এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েলের কাছে যেসব অভিযোগ তুলেছিলেন, তার মধ্যে ছিল-‘জেন ডো নম্বর ১০২’ নামে পরিচিত এক অপ্রাপ্তবয়স্ককে নিয়মিত যৌন নির্যাতন এবং বিভিন্ন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ। আরও অভিযোগ ছিল, ম্যাক্সওয়েল শত শত কিশোরীর তথ্যসংবলিত একটি কম্পিউটার ডেটাবেস পরিচালনা করতেন এবং এপস্টিনের বাড়িতে আসা মেয়েদের সময়সূচি তদারকি করতেন।
এপস্টিন তার প্রস্তাবিত জবাবে দাবি করেন, ‘জেন ডো নম্বর ১০২’-এর সঙ্গে কোনো যৌন সম্পর্ক হয়নি এবং তিনি নাকি জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে ১৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ‘এসকর্ট, কল গার্ল ও ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করতেন’। একই দিনে জুকারম্যান ইমেইলে এপস্টিনকে জানান, ডেইলি নিউজ “ব্যাপক আপত্তির মধ্যেও বড় ধরনের সম্পাদনা” করছে এবং শিগগিরই তিনি কপিটি পাঠাবেন। এর জবাবে এপস্টিন লেখেন, “সম্ভব হলে ঘিসলেনের নাম বাদ দিন।” শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ডেইলি নিউজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে উল্লেখ করা হয়—এপস্টিন তার এক অভিযোগকারীর সঙ্গে অজ্ঞাত অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। তবে ওই প্রতিবেদনে ম্যাক্সওয়েলের নাম বা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো উল্লেখ ছিল না। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক জুকারম্যান, যিনি আমেরিকা–ইসরায়েল ফ্রেন্ডশিপ লিগ ও প্রধান ইহুদি সংগঠনগুলোর সম্মেলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে এপস্টিনের অপরাধে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ কখনো ওঠেনি।
সাংবাদিকের বক্তব্য
২০১০ সালে ডেইলি নিউজ ছেড়ে যাওয়া সাংবাদিক জর্জ রাশ নিশ্চিত করেছেন, এপস্টিন জুকারম্যানকে চাপ দিয়ে খবরটি চাপা দিতে বা নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করেছিলেন। রাশ বলেন, এপস্টিন সাক্ষাৎকারের প্রস্তাব দেওয়ার পর পত্রিকাটি প্রতিবেদন প্রকাশ কিছুটা বিলম্বিত করেছিল। তবে তিনি সাক্ষাৎকারটি ‘অফ দ্য রেকর্ড’ রাখার শর্ত দেন এবং নিজেকে অতিউৎসাহী কৌঁসুলি ও অসাধু আইনজীবীদের শিকার হিসেবে তুলে ধরেন। রাশ আরও জানান, জুকারম্যান কখনোই প্রতিবেদন পুরোপুরি বাতিল করতে বা এপস্টিনের পক্ষে লেখার নির্দেশ দেননি। তবে আইনি ঝুঁকির কারণে ম্যাক্সওয়েলের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের সম্পর্ক
নথি অনুযায়ী, জুকারম্যান ও এপস্টিনের সম্পর্ক দুই দশকেরও বেশি পুরোনো। ২০০৫ সালে তারা যৌথভাবে গসিপ ও বিনোদনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘রাডার’ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন। ২০১৯ সালে এপস্টিনের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত সংক্রান্ত সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে জুকারম্যান তার সম্পত্তি উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নিয়ে এপস্টিনের পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং নিজের উইল ও সম্পদের বিস্তারিত তথ্য তাকে দিয়েছিলেন। সে সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯০ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে এপস্টিন জুকারম্যানের জন্য আর্থিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত সেবার বিনিময়ে প্রথমে ৩ কোটি ডলার এবং পরে সংশোধিত প্রস্তাবে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার ফি প্রস্তাব করেছিলেন।
ইমেইল গুলোতে জুকারম্যান এপস্টিনকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুজনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সাক্ষাতের তথ্যও নথিতে উঠে এসেছে।
-বেলাল হোসেন










