বিদায়বেলায় উপদেষ্টাদের খতিয়ান: কে কত নম্বর দিলেন নিজেদের?

ত্রয়োদশ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই চার্টার গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কেউ নিজেকে ৯৫ নম্বর দিয়েছেন, কেউবা ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক দুই দিন আগে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের দেড় বছরের কাজের মূল্যায়ন করেছেন উপদেষ্টারা। তাদের কেউ সফলতার তৃপ্তি নিয়ে ফিরছেন, কেউবা অতৃপ্তি আর সীমাবদ্ধতার গ্লানি নিয়ে।

ধর্ম উপদেষ্টা: ‘আমি ৯৫ শতাংশ সফল’

নিজেকে সবচেয়ে বেশি নম্বর দিয়েছেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, “আমি আমার কাজে ৯৫ শতাংশ সফল হয়েছি। আমার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হয়েছে।” তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও জনবল সংকটের কারণে শতভাগ সফল হতে পারেননি বলে জানান তিনি। বিশেষ করে ওয়াকফ প্রশাসনের ভূমি সংক্রান্ত জটিলতাগুলো কাটানোর জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন।

অর্থ উপদেষ্টা: ‘৭০ বা ৮০-এর বেশি নম্বর দেব না’

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজের মূল্যায়নে বেশ সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি খুব প্র্যাগমেটিক (বাস্তববাদী) মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেব? আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করে যেতে পারিনি। সে কারণেই আমি নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।” দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নৌপরিবহন ও শ্রম উপদেষ্টা: ‘সফলতা ৭০ শতাংশ’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন তার দুই মন্ত্রণালয়ের সফলতাকে ৭০ শতাংশে রেখেছেন। তিনি বলেন, “সাফল্যের শতাংশ আমি মেবি (সম্ভবত) ৭০ শতাংশ দেব। ৩০ শতাংশ হয়তো আরও ভালো হতে পারত।” তবে অস্থির সময়েও পুলিশ কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি এবং যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বিপ্লবের পর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জ্বালানি উপদেষ্টা: ‘সময় ও বিনিয়োগ কোনোটাই পাইনি’

জ্বালানি খাতে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে না পারার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, “জ্বালানি খাত ঘুরে দাঁড়াতে সময় ও বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার কোনোটাই আমি পাইনি।” আদানি চুক্তিসহ বড় সমস্যাগুলো এখন নির্বাচিত সরকার সমাধান করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভর্তুকি দিয়ে কোনো প্রকল্প না নেওয়ার অনড় অবস্থানও তিনি পুনরায় ব্যক্ত করেন।

ভূমি উপদেষ্টা: ‘ভেতরের তিক্ততা বাড়াতে চাই না’

খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনতে না পারার ব্যর্থতার পেছনে ‘সরকারের অভ্যন্তরীণ অসহযোগিতার’ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ভূমি নিবন্ধনকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমরা সফল হইনি। বিদায়ের সময় ভেতরের কথা নিয়ে তিক্ততা বাড়াতে চাই না।” সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারটি সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।

বাণিজ্য উপদেষ্টা: ‘আমাকে ক্ষমা করবেন, ভুলে যাবেন’

অন্যতম আবেগপ্রবণ বিদায়বার্তা দিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরে সাথে সাথে আমি আমার কর্মজীবনে ফেরত যাব। আশা করি আপনারা আমাকে ভুলে যাবেন এবং মাফ করে দেবেন।” গত দেড় বছর সাংবাদিকদের জবাবদিহিতার কারণে তিনি স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে পেরেছেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন যে, তিনি কোনো স্বজনপ্রীতি ছাড়াই সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

-লামিয়া আক্তার