যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
‘অ্যান ইন্টারভিউ উইথ তারেক রহমান লাইকলি বাংলাদেশ’স নেক্সট প্রাইম মিনিস্টার’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে পরিচালিত একাধিক জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপগুলোতে দেখা যায়, বিএনপির প্রতি জনসমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসালটিং পরিচালিত আরেক জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশের বেশি মানুষ তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে সামনে রেখে এর আগেও ব্লুমবার্গ, টাইম ও দ্য ইকোনমিস্টসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তারেক রহমানকে শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছিল। দ্য ডিপ্লোম্যাট সর্বশেষ তাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে ‘জেন জেড’ ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবে। ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ প্রজন্মের হওয়ায় তারাই মূলত পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করবে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জেন জেড-এর উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোতে।
প্রতিবেদনের জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকারে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পথে বাসযাত্রাকালে তারেক রহমান অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
জেন জেড প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি তরুণদের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি খাত ও শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো জেন জেড-এর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি জানান, ‘দ্য প্ল্যান’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছেন।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির নীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনীতি-নির্ভর পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে, যা পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও লাভের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
অর্থনীতি বিষয়ে তিনি বলেন, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। তিনি জানান, পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হলেও ভবিষ্যতে আইটি, সেমিকন্ডাক্টর, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জুতা শিল্প, এসএমই, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতে জোর দেওয়া হবে।
ঋণখেলাপি ও অর্থপাচার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, শক্তিশালী আর্থিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব। বিএনপি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দুর্নীতির কোনো ছাড় থাকবে না।
আইনশৃঙ্খলা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষ যেন নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং অর্থনীতির চাকা সচল থাকে—এমন পরিবেশ তৈরি করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করবে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পরিশেষে তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে এবং জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই হবে বিএনপির মূল অঙ্গীকার।