১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে ভোটের সমীকরণ বদলে গেছে। দেশের প্রায় ৩০টি আসন, যেখানে অতীতে আওয়ামী লীগ একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে, সেখানে এখন জয়-পরাজয় নির্ধারণে ‘আওয়ামী ভোট’ বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গ্রহণ করেছেন নানা বিচিত্র কৌশল।
সারাদেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জেলাগুলোতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেতে প্রার্থীরা সাবেক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, প্রয়াত নেতাদের কবর জিয়ারত এবং মামলা-হামলা থেকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
শরীয়তপুর ও মাদারীপুর : কবর জিয়ারত ও দলবদল
শরীয়তপুরের তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের দীর্ঘদিনের দাপট ছিল। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। গত কয়েক মাসে বহু আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। সখিপুর ও গোসাইরহাটে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারা এখন ধানের শীষের পক্ষে প্রচারে নামছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এলাকার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
মাদারীপুরেও একই ধারা লক্ষ্য করা গেছে। মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর কবর জিয়ারত করেছেন। এর পরপরই স্থানীয় ২০ জন আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নেন। নাদিরা আক্তার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না এবং নিরপরাধ কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর: মামলার আশ্বাস ও বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা
আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে এবার বিএনপি ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান জানিয়েছেন, নির্বাচিত হলে তিনি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা থেকে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি দিতে সহযোগিতা করবেন।
ফরিদপুর-৪ আসনেও অনেক আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। সেখানকার প্রার্থীরা আশ্বস্ত করছেন যে, যারা অন্যায় করেনি, তাদের এলাকায় ফিরে আসতে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।
ঠাকুরগাঁও ও বাগেরহাট: সংখ্যালঘু ও নিরাপত্তা কার্ড
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারদের মন জয়ে ব্যস্ত বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্দিরে গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। একই স্থানে জামায়াতের প্রার্থীও গিয়ে বিপদে-আপদে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাগেরহাটেও ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি না করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রার্থীরা।
জামালপুর ও ময়মনসিংহ: নতুন মেরুকরণ
জামালপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন। অন্যদিকে বকশীগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক পদধারী নেতাকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ভোট চাইতে দেখা গেছে। ময়মনসিংহেও বিএনপি ও এর বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি এড়ানোর নিশ্চয়তা দিয়ে নিজেদের শিবিরে টানার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে দলটির বিশাল ভোটার গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলে পড়ে, তার ওপরই নির্ভর করছে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল।
-লামিয়া আক্তার










