আইন ও বিধি উপেক্ষার অভিযোগ এনবিআর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে , হাইকোর্টে রিট

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে আইন, বিধি ও সাংবিধানিক কাঠামো উপেক্ষা করে রাষ্ট্রক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো পুনর্গঠনের নামে তিনি একের পর এক আইনগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
সরকারের রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে আলাদা করার পরিকল্পনা নতুন নয়। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ দিয়েছিল। কমিশনের প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পুনর্গঠন করে তিনটি আলাদা অধিদপ্তর আয়কর, শুল্ক ও আবগারি এবং ভ্যাট অধিদপ্তর গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে।
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি নতুন বিভাগ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। তবে সংবিধান ও রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ অনুযায়ী কোনো বিভাগ সৃষ্টির এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর (বা প্রধান উপদেষ্টার), যা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অন্তর্গত। আইন বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের কোনো বিভাগ সৃষ্টি সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, অধ্যাদেশটি উপদেষ্টা পরিষদে উত্থাপনের সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন তোলে। তবে সে বিষয়ে কোনো গুরুত্ব না দিয়েই অধ্যাদেশটি অনুমোদন করানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এনবিআর চেয়ারম্যান সরকারপ্রধানকে প্ররোচিত করে একটি বেআইনি ও অসাংবিধানিক অধ্যাদেশ পাস করান।
অধ্যাদেশ অনুমোদনের পর রুলস অব বিজনেস ও এলোকেশন অব বিজনেস সংশোধনের উদ্যোগ নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর ধারাবাহিকতায় বিভাগ দুটি সৃষ্টির প্রস্তাব ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি প্রাক-নিকার এবং ২০ জানুয়ারি নিকার সভায় অনুমোদিত হয়। তবে এখানেই শেষ নয়। সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন বিভাগ সৃষ্টি করতে হলে রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’র অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০১৮ সালের একটি পরিপত্র অনুযায়ী, রুলস অব বিজনেস সংশোধনের আগে ওই সচিব কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু নজিরবিহীনভাবে এই ধাপটি এড়িয়ে যান আব্দুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে বাইপাস করে তিনি ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে রুলস অব বিজনেস সংশোধনের সারসংক্ষেপে অনুমোদন নেন, যা আইন পরিপন্থি।
ওই সারসংক্ষেপে তিনি দাবি করেন, নির্বাচন ও গণভোটের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সচিবদের অংশগ্রহণে ১২ ফেব্রুয়ারির আগে সচিব কমিটির সভা ডাকা সম্ভব নয়। অথচ, একই দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১ ফেব্রুয়ারি সচিব কমিটির সভার নোটিশ জারি করে। এতে প্রমাণিত হয় যে, সারসংক্ষেপে উপস্থাপিত তথ্য ছিল মিথ্যা বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এরপরও থেমে থাকেননি এনবিআর চেয়ারম্যান। রুলস অব বিজনেসের বিধি ১২ ও ১৩ অনুযায়ী নতুন বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা করেননি। বরং ২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে পত্র পাঠানোর পর তিনি পুনরায় আরেকটি সারসংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠান। সেখানে বলা হয়, পরবর্তীতে ‘ভূতাপেক্ষিকভাবে’ পদের অনুমোদন নেওয়া হবে যা প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক রীতির সম্পূর্ণ ব্যত্যয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, কর ও কাস্টমস ক্যাডার থেকে দুটি সচিব পদ সৃষ্টি করাই ছিল আব্দুর রহমানের মূল লক্ষ্য। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এই উদ্যোগ বৈধতা পাবে না আশঙ্কা থেকেই তিনি তড়িঘড়ি করে আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক যুগ্মসচিব তানভীর আহমেদ হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রিট আবেদন করেছেন। রিটে অধ্যাদেশের সাংবিধানিক বৈধতা, রুলস অব বিজনেস লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের কাঠামো পরিবর্তন সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ ও ৯৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি, নীতি বাস্তবায়নের কাজকে ‘বিভাগ’-এর কার্যপরিধির মধ্যে আনা রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬-এর নির্ধারিত কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ অভিযোগের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, এ-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অপসংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক জেলা দায়রা জজ মোস্তাক আহমেদ সাদানী বলেন, এনবিআরের রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো পুনর্গঠনের নামে আইনগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন হয়েছে। এসব বিষয়ে তড়িঘড়ি করা উচিত নয়। যেহেতু সামনে নির্বাচিত সরকার আসবে, বিষয়টি তাদের জন্য রেখে দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।