অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎ এক সময় মনে হয় চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মন যেন আর কাজ করছে না। একের পর এক মিটিং, ইমেইল আর দায়িত্বের চাপে দুপুর গড়ালেই অনেকেরই এমন অবস্থা হয়। ক্লান্তি কেবল আপনার গতিই কমিয়ে দেয় না, এটি আপনার মনোযোগের ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। তখন ছোট কাজও বড় মনে হয়। দুপুরের লাঞ্চের পর এই সমস্যা বা ‘আফটারনুন স্লাম্প’ প্রায় সব কর্মজীবীর পরিচিত অভিজ্ঞতা।
মনোবিজ্ঞান বলছে কিছু ছোট এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত অভ্যাসই শরীর ও মনকে আবার সতেজ করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত চা কফি খাওয়া বা দুপুরে ঘুমানোর দরকারও পড়ে না। বিজ্ঞানসম্মত এবং মনস্তাত্ত্বিক এই উপায়গুলো আপনাকে অফিসে আরও বেশি কর্মক্ষম থাকতে সাহায্য করবে। নিচে মনোবিজ্ঞানের আলোকে এমন ৬টি সহজ কৌশলের কথা আলোচনা করা হলো যা আপনার একঘেয়েমি কাটিয়ে মনোযোগ ফিরিয়ে আনবে।
১. মাইক্রোব্রেক বা ছোট বিরতি নিন
টানা কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর কি মাথা ঝিমিয়ে আসে এটাকে বলা যায় ব্রেন ফগ। এমন অবস্থায় সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো ছোট ছোট বিরতি নেওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর মাত্র ১ থেকে ২ মিনিটের একটি বিরতি আপনার মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে জাদুর মতো কাজ করে। ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অফ গ্রোনিঞ্জেন এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে কাজের ফাঁকে সামান্য বিরতি নিলে তা মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং কাজের মান উন্নত করে। তাই প্রতি ৩০ থেকে ৪০ মিনিট কাজ করার পর চেয়ার থেকে একটু উঠে দাঁড়ান অথবা জানালা দিয়ে বাইরে মানুষের চলাচল দেখুন। এই সামান্য বিরতিটুকুই আপনার মস্তিষ্ককে রিচার্জ করার জন্য যথেষ্ট।
২. পোমোডোরো পদ্ধতি অনুসরণ করুন
কাজের চাপকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেওয়া এবং মাঝে বিরতি রাখাই হলো পোমোডোরো পদ্ধতির মূল কথা। ধরুন আপনি ২৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন এবং এরপর ৫ মিনিটের একটি বিরতি নেবেন। এটি আপনাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেয় এবং ইচ্ছাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে দীর্ঘ সময় ধরে অনেক বেশি মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করলে ক্লান্তি খুব দ্রুত বাড়ে। কিন্তু যদি নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি নিয়ে কাজ করা যায় তবে দীর্ঘমেয়াদে কাজের দক্ষতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।
৩. কর্মক্ষেত্রের আলোর সঠিক ব্যবহার
অফিসের আলো যদি কম হয়, তবে তা আপনার শরীরকে সন্ধ্যার সংকেত দেয় এবং ঘুম ঘুম ভাব আনে। একে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাত। সম্ভব হলে প্রাকৃতিক আলো বা উজ্জ্বল সাদা আলোর নিচে কাজ করুন। ২০২৩ সালের আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে যে ভালো আলোর ব্যবস্থা থাকলে কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি কমে এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই চেষ্টা করুন দিনের বেলা জানালার কাছ থেকে আসা প্রাকৃতিক আলোতে কাজ করতে।
৪. ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন
অফিসের অধিকাংশ সময় আমাদের কম্পিউটার বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এতে চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়। এর সমাধানে ২০-২০-২০ নিয়মটি দারুণ কার্যকর। প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এটি ডিজিটাল আই স্ট্রেইন কমায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
৫. শ্বাসের ব্যায়াম
ক্লান্তি যখন খুব বেশি হয় তখন আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস অনেক সময় অগভীর হয়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায় এবং মনোযোগ নষ্ট হয়। ৪-৭-৮ শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়ামটি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন এবং ৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। ডেস্কে বসেই এটি তিনবার করুন। কেউ টেরও পাবে না, অথচ আপনার স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হবে এবং ফোকাস ফিরে আসবে।
৬. মস্তিষ্ক সচল রাখার মতো পুষ্টিকর খাবার
ক্ষুধা এবং ক্লান্তি একসাথে হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘হ্যাংরি’। এই সময় চা বা কফির বদলে বাদাম, বেরি বা ডার্ক চকোলেট খান। এই খাবারগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। পুষ্টিবিদদের মতে, সঠিক খাবার মানসিক ধীরগতি দূর করতে সাহায্য করে।
মাহমদু সালেহীন খান










