খালাস জটিলতায় সাগরে আটকে ২৩ লাখ টন ভোগ্যপণ্য

রমজান মাসকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর আমদানির পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। নতুন করে অনেক প্রতিষ্ঠান আমদানিতে যুক্ত হলেও তাদের বড় অংশেরই পর্যাপ্ত গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধা নেই। ফলে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য নামানোর পর ঘাটে দ্রুত খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এতে লাইটার জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে। একই সঙ্গে আমদানি বৃদ্ধির কারণে লাইটার জাহাজের চাহিদা বেড়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তালিকা অনুযায়ী, বহির্নোঙরে অবস্থানরত ১০৪টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ৪৬টিতে ভোগ্যপণ্য রয়েছে। এসব জাহাজে মোট ভোগ্যপণ্যের পরিমাণ ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টন। এক বছর আগে একই সময়ে বন্দরে ২৬টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন ভোগ্যপণ্য ছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভোগ্যপণ্যবাহী জাহাজ ও পণ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বন্দরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সকাল পর্যন্ত সাড়ে ১০ লাখ টন ভোগ্যপণ্য খালাস করা হয়েছে, আর প্রায় পৌনে ১৩ লাখ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি সময়ে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে গম। বহির্নোঙরে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে ২৫টি জাহাজ গম বহন করছে। এসব জাহাজে মোট সাড়ে ১৩ লাখ টন গম এসেছে, যার মধ্যে ৫ লাখ ৮০ হাজার টন খালাস হয়েছে। ছোলা, মসুর ডাল ও মটর ডালবাহী ৭টি জাহাজে এসেছে ২ লাখ ৩৬ হাজার টন পণ্য, এর মধ্যে এক লাখ টন খালাস করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯টি জাহাজে ৪ লাখ ৩৯ হাজার টন তৈলবীজ এসেছে, যার মধ্যে আড়াই লাখ টন খালাস হয়েছে।

বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বড় জাহাজ থেকে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন ভোগ্যপণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এসব লাইটার জাহাজ নদীপথে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (ডব্লিউটিসিসি) আওতায় আগে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজ থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২টিতে। জাহাজের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় পণ্য পরিবহন সংকট আরও বেড়েছে।

ডব্লিউটিসিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ দিন থেকে দেড় মাস ধরে দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে ২৬৫টি লাইটার জাহাজ। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্য বহনকারী লাইটার জাহাজের সংখ্যা ১২২টি।

ডব্লিউটিসিসির তথ্য অনুযায়ী, এস এস ট্রেডিংয়ের ১৩টি লাইটার জাহাজ এক থেকে দেড় মাস ধরে গম নিয়ে নারায়ণগঞ্জ, নোয়াপাড়া ও কাঁচপুর ঘাটে আটকে আছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী জানান, তাদের নিজস্ব গুদাম না থাকায় এবং ক্রেতারা সময়মতো পণ্য খালাস না নেওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ঘাটে শ্রমিক সংকটও সমস্যা বাড়িয়েছে।

এস এস ট্রেডিংয়ের পাশাপাশি এন মোহাম্মদ, আকিজ গ্রুপ, বিশ্বাস গ্রুপ ও মদিনা ট্রেডিংয়ের আমদানি করা ভোগ্যপণ্যবাহী লাইটার জাহাজও বিভিন্ন ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে।

লাইটার জাহাজ বরাদ্দে যুক্ত পরিবহন এজেন্ট এমএসটি মেরিন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, যেসব আমদানিকারকের নিজস্ব গুদাম নেই, তারা দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারছেন না। ফলে নতুন লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ ঘাটে এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে পণ্য খালাস হওয়ায় সময় বেশি লাগছে।

অন্যদিকে বড় শিল্পগ্রুপগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কয়েকটি গ্রুপের নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে এবং নিজস্ব ঘাটে ক্রেনের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি গ্রুপ ও আকিজ রিসোর্স গ্রুপের লাইটার জাহাজ এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই খালি করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, আমদানি বাড়লেও লাইটার জাহাজের সংখ্যা কমেছে এবং অনেক ঘাটে আধুনিক খালাসব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাসের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

আফরিনা সুলতানা/