বাংলাদেশ ব্যাংকে ‘ব্যবসায়ী’ গভর্নর: স্বার্থের সংঘাত ও স্বাধীনতা নিয়ে তাসনিম জারার ৫ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই নিয়োগের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট) তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডা. তাসনিম জারা।

বুধবার (২৫ফেব্রুয়ারি) রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘দীর্ঘমেয়াদী প্রভাববিস্তারকারী’ আখ্যা দিয়ে পাঁচটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গভর্নরের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে, যাতে ভিন্নমতের সরকার এলেও তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে গভর্নর বদলানোর সিদ্ধান্তকে তিনি সচিবালয়ের রদবদলের চেয়ে ভিন্ন ও গভীর মাত্রার সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন।

 

 

তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের ভূমিকা এক নয়। সচিব সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করেন, তাই সরকার বদলালে সচিব বদলানো স্বাভাবিক। কিন্তু গভর্নরের প্রধান কাজ হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। অনেক সময় সরকারকে ‘না’ বলার সাহসও গভর্নরকে দেখাতে হয়। তিনি বলেন, “যখন রাজনৈতিক চাপে মুদ্রা ছাপানোর তাগিদ আসে, তখন গভর্নরকে দাঁড়াতে হতে পারে সরকারের বিপরীতে।”

তিনি আরও লিখেছেন, ‘গভর্নরের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে, যাতে তিনি রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ার চার বছরের মেয়াদে থাকেন। ভিন্নমতের প্রেসিডেন্টও সেই মেয়াদে হাত দেন না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর বদলানো তাই সচিবালয়ে রদবদলের চেয়ে ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত।’

সবশেষে পাঁচটি প্রশ্ন তুলে জারা লিখেছেন, ‘সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দিয়েছেন। আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্তটার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে। সামনের দিনগুলোতে যে যে বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন:

১. গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে একমত না হলে সেটা বলতে পারছেন? নাকি প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে আসছে?

২. নতুন গভর্নর কি তার সব ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা সত্যিকার অর্থেই ত্যাগ করেছেন? নাকি নিয়োগপত্রের শর্ত শুধু কাগজে থাকবে?

৩. ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষত। নতুন গভর্নর কি এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হচ্ছেন?

৪. সুদের হার, মুদ্রা সরবরাহ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কি আগের নীতি অব্যাহত থাকছে, নাকি হঠাৎ পরিবর্তন আসছে? যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে সেটা কাকে সুবিধা দিচ্ছে?

৫. টাকার মান কি বাজারভিত্তিক থাকছে, নাকি অতীতের সরকারের মতো কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?

উল্লেখ্য, বুধবার এক নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে সরকার মোস্তাকুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়। মোস্তাকুর রহমান পেশায় একজন ব্যবসায়ী ও হিসাববিদ (এফচিএমএ), যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যবসায়ীর শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার ঘটনা।

ডা. তাসনিম জারার এই বিশ্লেষণাত্মক পোস্টটি ইতিপূর্বেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা নতুন গভর্নরের জন্য এক ধরনের ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

লামিয়া আক্তার