বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ : আইসিসির ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতির নগ্ন প্রকাশ

ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়া এমন এক সংকট, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যত কেউ কথা বলতে চায় না। দক্ষিণ এশিয়ার টকশো ও বিশ্লেষণে বিষয়টি আলোচিত হলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটি প্রায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অথচ বিষয়টি কেবল একটি দলের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া নয়; বরং বিশ্ব ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

এই নীরবতার কারণ এবং বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপের বাইরে এই দুই প্রশ্নের উত্তর মূলত একটাই: বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একচেটিয়া ক্ষমতা।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর দায়িত্ব ছিল বৈশ্বিক ক্রিকেটের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু গত দুই দশক ধরে যে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, গত কয়েক বছরে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে আইসিসির কার্যত নীতিগত অবস্থান এখন ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষা ধার করলে বলা যায়, আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারতকে সবার আগে রাখা হয়।

ভারত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট খেলে না, পাকিস্তানে খেলতে যায় না। পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভারতে খেলতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই রাজনৈতিক হলেও আইসিসি বরাবরই নীরব থেকেছে।

কিন্তু একই ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে, তাকে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দেওয়া হয়। এখানেই আইসিসির দ্বৈত নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতের যুক্তিগুলো যদি প্রশ্নাতীত হয়, তাহলে বাংলাদেশের যুক্তিগুলোও একইভাবে বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আর্থিক ‘গ্রেভি ট্রেন’ এর চালক নয় এবং আইসিসি বোর্ডে তাদের সংখ্যাগত প্রভাবও সীমিত। ফলে সিদ্ধান্তের ভার স্বাভাবিকভাবেই ভারতের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টাইগার তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। নিরাপত্তা হুমকির কারণে তাকে আইপিএল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। যদি সেই হুমকি এতটাই গুরুতর হয় যে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিতে হয়, তাহলে পুরো বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে কীভাবে অমূলক বলা যায়?

তবুও আইসিসির দাবি ভারতে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। কিন্তু আইসিসির ওপর ভারতের প্রভাব এতটাই গভীর যে এমন বক্তব্য ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ভারত কখন, কোথায় খেলবে তা নিজের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করতে পারে; অন্য দেশগুলো সে সুযোগ পায় না।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সামনে প্রশ্ন ছিল তারা কি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেবে? লেখকের মতে, পাকিস্তানের অংশগ্রহণ করা উচিত, কারণ তারা আগেই শর্ত মেনে নিয়েছে যে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে।

তবে একই সঙ্গে পাকিস্তানের উচিত আইসিসির ভেতরে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা ভারতের প্রতি আইসিসির পক্ষপাতের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা প্রয়োজন। পাকিস্তান দেখাতে পারে একই পরিস্থিতিতে ভারত ছাড় পায়, অন্যরা পায় না।

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো বিশ্ব ক্রিকেটের তথাকথিত অভিভাবকদের নীরবতা। কোথায় শীর্ষ ধারাভাষ্যকাররা? কোথায় কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা? কোথায় ক্রিকেটীয় নৈতিকতার প্রবক্তারা? উত্তর একটাই কোথাও নেই। কারণ টাকা কথা বলে, আর সেই টাকার উৎস ভারত।

বিশ্বকাপ মানেই ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ এই অঘোষিত বাধ্যবাধকতাই প্রমাণ করে, ক্রিকেট কতটা ব্যবসার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। নীতি, নৈতিকতা ও রাজনীতি সবই চাপা পড়ে যায় রাজস্বের নিচে। আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। লোভ ও রাজনৈতিক স্বার্থ খেলাটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কিন্তু কে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? কে থামাবে এই একচেটিয়া দাপট? উত্তর কেউ না। কারণ ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতিতে অন্যরাও নিজেদের স্বার্থ খুঁজে পায়। ভারতের দাদাগিরি চলতেই থাকে, আর বিশ্ব নীরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে থাকে। দৃশ্যটা কি খুব অপরিচিত?

-এমইউএম