জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং স্মার্ট হোম প্রযুক্তির প্রসারের ফলে রান্নাঘরের চুলাতেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন চোখে পড়ছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এখন শহরাঞ্চলে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে বৈদ্যুতিক চুলা—বিশেষ করে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড প্রযুক্তিনির্ভর চুলা। তবে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই দুই প্রযুক্তির মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী?
ইন্ডাকশন চুলা: চৌম্বক প্রযুক্তির ব্যবহার
ইন্ডাকশন চুলা মূলত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এতে চুলার ভেতরে থাকা কপার কয়েল থেকে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা সরাসরি হাঁড়ি বা পাত্রকে গরম করে। ফলে চুলার পৃষ্ঠ নয়, বরং পাত্র নিজেই তাপ উৎপন্ন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডাকশন চুলার এনার্জি এফিশিয়েন্সি প্রায় ৮৫–৯০ শতাংশ, যা গ্যাস বা সাধারণ বৈদ্যুতিক চুলার তুলনায় অনেক বেশি। রান্নার সময় কম লাগে, তাপ নিয়ন্ত্রণ সহজ এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
তবে এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—সব ধরনের পাত্র ব্যবহার করা যায় না। শুধুমাত্র ফেরোম্যাগনেটিক (লোহার তলাযুক্ত) পাত্র প্রয়োজন হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহে ওঠানামা হলে ইন্ডাকশন চুলা কার্যকারিতা হারাতে পারে।
ইনফ্রারেড চুলা: তাপ বিকিরণভিত্তিক প্রযুক্তি
ইনফ্রারেড চুলা কাজ করে ইনফ্রারেড রেডিয়েশন বা তাপ বিকিরণের মাধ্যমে। এতে থাকা হিটিং এলিমেন্ট গরম হয়ে তাপ ছড়িয়ে দেয়, যা পাত্র ও খাবার গরম করে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি ইন্ডাকশনের তুলনায় সহজ এবং যেকোনো ধরনের পাত্র ব্যবহার করা যায়—অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, কাচ বা মাটির পাত্রও।
তবে ইনফ্রারেড চুলার এনার্জি এফিশিয়েন্সি তুলনামূলক কম (৬৫–৭০ শতাংশ)। রান্নার সময় বেশি লাগে এবং চুলার পৃষ্ঠ গরম হয়ে যাওয়ায় পোড়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
বিদ্যুৎ ব্যবহার ও খরচ
বিদ্যুৎ খরচের দিক থেকে ইন্ডাকশন চুলা সাধারণত বেশি কার্যকর। একই পরিমাণ খাবার রান্নায় ইন্ডাকশন কম সময় ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ইনফ্রারেড চুলায় সময় বেশি লাগায় দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে বাজারমূল্যের দিক থেকে ইনফ্রারেড চুলা সাধারণত সস্তা, আর ইন্ডাকশন চুলার দাম কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সাশ্রয়ী হতে পারে।
নিরাপত্তা ও স্মার্ট ফিচার
ইন্ডাকশন চুলায় ওভারহিট প্রোটেকশন, অটো শাটডাউন, টাচ কন্ট্রোল, টাইমারসহ নানা স্মার্ট ফিচার থাকে, যা আধুনিক স্মার্ট হোম ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইনফ্রারেড চুলাতেও কিছু আধুনিক ফিচার থাকলেও নিরাপত্তার দিক থেকে ইন্ডাকশন এগিয়ে।
কোনটি কার জন্য উপযোগী
প্রযুক্তিবিদদের মতে—
-
শহুরে ব্যবহারকারী, দ্রুত রান্না ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় চাইলে ইন্ডাকশন চুলা উপযোগী
-
গ্রাম বা আধা-শহর এলাকায়, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পাত্র ব্যবহৃত হয়, সেখানে ইনফ্রারেড চুলা সুবিধাজনক
চুলা নির্বাচন এখন আর শুধু রান্নার বিষয় নয়, বরং এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত। ইন্ডাকশন চুলা আধুনিক, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হলেও নির্দিষ্ট পাত্রের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইনফ্রারেড চুলা সহজ ও বহুমুখী হলেও বিদ্যুৎ দক্ষতায় পিছিয়ে।
ভোক্তার প্রয়োজন, বাজেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা—এই তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করেই ঠিক হবে, চুলা হবে ইন্ডাকশন না ইনফ্রারেড।
-মামুন










