বইয়ের স্পর্শ ছাড়াই চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান

এসএম শামসুজ্জোহা:

চলতি নতুন শিক্ষাবর্ষের ১৮ দিন পার হয়ে গেলেও এখনও দুই কোটির বেশি বই মুদ্রণই হয়নি। ফলে ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বই ছাড়াই চলছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। বর্তমানে বই ছাপার যে পরিস্থিতি, তাতে শিক্ষার্থীদের সব বই হাতে পেতে সময় লাগবে আরও এক মাস। এতেও সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে কি-না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখনও মাধ্যমিকের দুই কোটির বেশি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি এবং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের প্রায় এক কোটি ১০ লাখের বেশি। এ ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘অধিকাংশ পাঠ্যবই চলে গেছে। সামান্য কিছু বই যায়নি। সেগুলোর মুদ্রণকাজ চলছে। জানুয়ারির মধ্যেই সব বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’

জানা যায়, রীতি অনুযায়ী বছরের প্রথমদিন স্কুলে স্কুলে ‘বই উৎসব’ করে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বই। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ব্যত্যয় ঘটেছে এবার। শুধু বই উৎসব নয়, নতুন বছরের শুরু থেকে অধিকাংশ ক্লাসের শিক্ষার্থী দুয়েকটি ছাড়া সব বই এখনো হাতে পায়নি। যদিও মুদ্রণকারীরা বলছেন, চলতি মাস তো নয়ই, মার্চের আগে পাওয়া যাবে না সব বই।

এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নতুন বই হাতে পেতে যত দেরি হবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতিও তত বাড়বে। যথাসময়ে বই দিতে প্রিন্টার্সগুলোকে তাগাদা দিচ্ছেন তারা। কর্মকর্তাদের দাবি, গত দেড় দশকে জানুয়ারি মাসে কখনই শতভাগ বই পৌঁছানো যায়নি। কখনও কখনও মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছে। সেই অর্থে এবার ৩০ জানুয়ারির মধ্যে সব বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হলে, তা হতে পারতো এনসিটিবির জন্য নতুন মাইলফলক। নতুন বছরে নতুন ক্লাসে নতুন বই শিশুদের কাছে আনন্দের যেন কোনো সীমা থাকে না। সুন্দর নতুন বই পাওয়ার আনন্দ শিশুদের পাঠের উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। তারা সে বই শুঁকে দেখে, বুকে জড়িয়ে ধরে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, এবার প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি বই। এর মধ্যে গতকাল শনিবার বিকাল পর্যন্ত ছাপা শেষে বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য নতুনভাবে দেড় লাখের মতো বইয়ের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। যা বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও কয়েক লাখ বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ প্রায় শেষ। আর দশম শ্রেণির এক কোটি বই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ছাপানোর কারণে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বাকি বইগুলো ছাপার কাজ দেরি হওয়ার কারণে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে উৎপাদন নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) আবু নাসের টুকু বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মাধ্যমিকের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে নাÑ এমন বাস্তবতাকে মাথায় রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বইয়ের ছাপার কাজ সম্পন্নে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই তিন বইও সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে কোনো শ্রেণিতে একটি, কোনোটিতে দুটি বই দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ করতে আমরা দিন-রাত কাজ করছি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০টি স্কুলের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ৩-৬টি করে পেয়েছেন। অন্যান্য শ্রেণির বইও কোনো কোনো স্কুলে সব কপি যায়নি। ওইসব স্কুলের একটি খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির পঞ্চম শ্রেণির প্রভাতি শাখার শিক্ষার্থীরা একটি করে বই পেয়েছে। দেশসেরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে গেছে ১২টির মধ্যে মাত্র ৫টি বই। খিলগাঁওয়ের ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে এখনও তিনটি বই পায়নি শিক্ষার্থীরা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকা থেকে একইভাবে আংশিক বই যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গতকাল শনিবার দেশের বেশ কয়েকটি জেলা-উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো উপজেলায় মাধ্যমিকের একটি, কোনোটিতে দুটি বই পৌঁছেছে। আবার কোনো কোনো উপজেলায় এখন পর্যন্ত একটি বইও পৌঁছেনি। যেসব উপজেলায় বই পৌঁছেছে, তা শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বই না নিয়েই স্কুল থেকে ফিরতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, মাধ্যমিকে এখন পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ বই আসেনিÑ এসেছে ৩৫ শতাংশ। প্রাথমিকে ৪৫ শতাংশ এলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সব বই আসেনি। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই বছরের প্রথমদিনে নতুন বইয়ের স্পর্শ পাবে না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর চট্টগ্রাম জেলায় প্রাথমিকে বইয়ের চাহিদা প্রায় ৪৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত এসেছে ১৭ লাখ ৮৭ হাজারের মতো, যা চাহিদার ২৮ শতাংশের মতো। এর মধ্যে পটিয়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, বোয়ালখালী ও বাঁশখালী উপজেলায় কোনো বই পৌঁছেনি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম আবদুর রহমান বলেন, এখনও সব বই আসেনি। চাহিদার মাত্র ২৮ শতাংশ এসেছে। আশা করা যায়- জানুয়ারির মধ্যে সব বই এসে যাবে।

চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উত্তম খীসা বলেন, জানুয়ারির শুরু থেকেই নতুন বই আসা শুরু হয়েছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বেশকিছু বই ইতোমধ্যে এসেছে। ধাপে ধাপে অন্যান্য শ্রেণির বই আসছে। তবে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১৩ লাখ তিন হাজার ৩৮৬ কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত রাজশাহী জেলার চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত বই পাওয়া যায়নি। রাজশাহী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুসারে, রাজশাহী জেলায় মাধ্যমিক (বাংলা ভার্সন) শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখ ২৮ হাজার ৯৬০ জন। এর বিপরীতে ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৫ কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র দুটি শ্রেণির জন্য তিনটি করে বই হাতে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মুদ্রণকারী জানান, পাঠ্যবই ছাপার চুক্তির সময়সীমা গত ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এরপর বই ডেলিভারির জন্য আরও ৪০ দিন সময় পাওয়া যাবে। তাই দ্রুত বই দেওয়ার জন্য তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবুও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুতই বই দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু ব্যাংক লোন, কাগজ সংকটসহ অন্যান্য জটিলতার কারণে ছাপার কাজ দ্রুত এগোতে পারছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একেএম রিয়াজুল হাসান বলেন, চলতি নতুন শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি। কাগজ সংকটের সমাধান করেছি। ব্যাংকের ও বিদ্যুতের সমস্যা ছিল। সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শামসুজ্জোহা/সানা/