দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিবর্তে গঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন। প্রস্তাবিত নতুন এই কমিশনের ক্ষমতা, মর্যাদা ও কার্যপরিধি বর্তমান ইউজিসির তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এরইমধ্যে উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়া অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা হবে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান এবং কমিশনারদের মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ের। পাশাপাশি কমিশনের সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নতুন কমিশন গঠিত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না। কমিশন নিজ ক্ষমতাবলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, যা ইউজিসির ক্ষেত্রে ছিল সীমিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াটি মতামতের জন্য বিভিন্ন অংশীজনের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে এই খসড়া ইউজিসির পক্ষ থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬টি, যার মধ্যে ৫১টির কার্যক্রম চালু রয়েছে। অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১৬টি, যদিও কয়েকটির কার্যক্রম বন্ধ। অধিভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসাসহ উচ্চশিক্ষা খাতে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি।
উল্লেখ্য, দেশের উচ্চশিক্ষাকে তদারকি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ইউজিসি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি বিধিবদ্ধ রূপ পায়। শুরুতে মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা ইউজিসি গত পাঁচ দশকে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থ বরাদ্দ ও নীতিগত সুপারিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও ইউজিসির কার্যকর ক্ষমতা বাড়েনি। এ কারণে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেই ইউজিসিকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই ইউজিসিকে শক্তিশালী করা বা উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের আলোচনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটি চূড়ান্ত বাস্তবায়িত হবে কি না—সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। তবে ইউজিসির কর্মকর্তারা আশাবাদী যে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। প্রয়োজনে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সুযোগ থাকবে, যা বর্তমানে ইউজিসির ক্ষেত্রে নেই। কমিশনে থাকবেন একজন চেয়ারম্যান, আটজন কমিশনার ও ১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য। বর্তমানে ইউজিসিতে একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন পূর্ণকালীন সদস্য রয়েছেন।
সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁদের মেয়াদ হবে চার বছর, তবে পুনর্নিয়োগের সুযোগ থাকবে। চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের পিএইচডিধারী শিক্ষাবিদ হতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান কেবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন হবেন, যদিও তিনি কেবিনেট মন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হবেন না। কমিশনারদের মর্যাদা হবে আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান। বর্তমানে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী ইউজিসি চেয়ারম্যানের অবস্থান ১৬ নম্বরে।
প্রস্তাবিত কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার চাহিদা নিরূপণ, গুণগত মানোন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ, নীতি ও নীতিমালা প্রণয়ন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি, দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রকল্পের নজরদারি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রতি তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া কমিশন প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, হিসাব তলব, মূল্যায়ন এবং অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হলে বরাদ্দ স্থগিত, কোর্স বা প্রোগ্রামের অনুমোদন বাতিল কিংবা ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে কমিশনের হাতে। তবে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে পারবে।
প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগকে শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, উচ্চশিক্ষার বিস্তার যেভাবে বেড়েছে, তদারকির কাঠামো সেভাবে শক্তিশালী হয়নি। নতুন কমিশন গঠিত হলে মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা তদারকি ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ইউজিসির লোকবল কম এবং কাজের স্বাধীনতাও সীমিত। উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করে যোগ্য লোকবল ও কার্যকর স্বাধীনতা দেওয়া হলে তা দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য ইতিবাচক হবে। তবে তিনি এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।










