আজ ১৭ জানুয়ারি বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেনের মৃত্যু বার্ষিকী। শহরের মহাকালী পাঠশালায় (বর্তমানে টাউন গার্লস হাই স্কুল) পড়ালেখা শেষে স্থানীয় পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন সুচিত্রা। নানা অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ও থিয়েটারে তিনি অভিনয়ের দক্ষতা দেখান। পাবনার মেয়ে রমা ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের বধূ হয়ে সংসারজীবন শুরু করেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী।
তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রথম পা রাখেন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে । প্রথম ছবি করেন শেষ কোথায়। তবে ছবিটি আর মুক্তি পায়নি। এরপর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে সাড়ে চুয়াত্তর ছবি করে সাড়া ফেলে দেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে। সুচিত্রা সেন বাংলা ও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন। তার অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি দেবদাস (১৯৫৫)। সুচিত্রা সেন ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রণয় পাশা ছবি করার পর লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এরপর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি।
সুচিত্রা সেন ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভক্ত। একবার তিনি গোপনে কলকাতা বইমেলায় গিয়েছিলেন। বলিউড-টালিউডের বহু পরিচালক সুচিত্রা সেনকে নিয়ে ছবি করতে চাইলেও তিনি এতে সম্মত হননি। এমনকি দেশ-বিদেশের কোনো পরিচালক বা অভিনেতা বা অভিনেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ও দেননি তিনি। সেই থেকে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যান। যদিও তার বাসভবনে তিনি কেবল কথা বলেছেন তার একমাত্র মেয়ে মুনমুন সেন এবং দুই নাতনি রিয়া ও রাইমার সঙ্গে।
সুচিত্রা সেন ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে সাত পাকে বাঁধা ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পান। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলাবিভূষণ সম্মাননা দেওয়া হয় তাকে। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে সুচিত্রা সেনকে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে সুচিত্রা সেন দিল্লিতে গিয়ে ওই সম্মান নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সুচিত্রা সেনের ছবি : ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে অভিনয় করেন সাত নম্বর কয়েদি ছবিতে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৮ এই ২৬ বছরে তিনি ৬২টি ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে তিনি প্রথম ছবি করেন সাড়ে চুয়াত্তর। এ ছবিটি বক্স অফিস হিট করে।
উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে: অগ্নি পরীক্ষা (১৯৫৪), গৃহ প্রবেশ (১৯৫৪), ঢুলি (১৯৫৪), মরণের পরে (১৯৫৪), দেবদাস (১৯৫৫-হিন্দি), শাপমোচন (১৯৫৫), সবার উপরে (১৯৫৫), মেঝ বউ (১৯৫৫), ভালবাসা (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), ত্রিযামা (১৯৫৬), শিল্পী (১৯৫৬), একটি রাত (১৯৫৬), হারানো সুর (১৯৫৭), পথে হল দেরী (১৯৫৭),জীবন তৃষ্ণা (১৯৫৭), চন্দ্রনাথ (১৯৫৭), মুশাফির (১৯৫৭-হিন্দি), রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), ইন্দ্রানী (১৯৫৮), দ্বীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৮), চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯), হসপিটাল (১৯৬০), বোম্বাই কা বাবু (১৯৬০-হিন্দি), সপ্তপদী (১৯৬১), সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩), মমতা (১৯৬৬), গৃহদাহ (১৯৬৭), কমললতা (১৯৬৯), মেঘ কালো (১৯৭০), ফরিয়াদ (১৯৭১), আলো আমার আলো (১৯৭২), হার মানা হার (১৯৭২), দেবী চৌধুরাণী (১৯৭৪), শ্রাবণ সন্ধ্যা (১৯৭৪), প্রিয় বান্ধবী (১৯৭৫), আঁধি (১৯৭৫-হিন্দি), দত্তা (১৯৭৬) এবং সর্বশেষ প্রণয়পাশা (১৯৭৮)।
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা পাবনার গোপালপুর এলাকার হিমসাগরে অবস্থিত। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়িতে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুলাই অর্থাৎ সুচিত্রা সেনের মৃত্যুর ছয় মাস পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়িটি দখলদার মুক্ত করা হয়। তারপর সেখানে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা নামফলক লিখে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। এখানে সুচিত্রা সেনের ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী, ছবি, পুরস্কার, চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে। এ সবকিছু মিলিয়ে সুচিত্রা সেনের জীবন ও কর্মের একটি সম্পূর্ণ চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। এ সংগ্রহশালা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। প্রধান ফটকে গিয়ে ১০ টাকার বিনিময়ে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন যে কেউ। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতে পারেন এ সংগ্রহশালা।
দীর্ঘ ২৫ দিন লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি সকালে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। একমাত্র মেয়ে অভিনেত্রী মুনমুন সেন, নাতনি রাইমা ও রিয়া সেনসহ অগণিত ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে যান তিনি।
কলকাতার ঐতিহাসিক কেওড়াতলা মহাশ্মশানে কাঠের চুল্লিতে সুচিত্রা সেনের শেষকৃত্য করা হয়। তার মরদেহ দাহ করা হয় চন্দন কাঠে। মৃত্যু পরর্বর্তী সময়ে তার মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বালিগঞ্জের নিজ বাসভবনে, যেখানে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের জনতা।
মাহমুদ সালেহীন খান










