ব্রিজিত বার্দো: ফ্রান্সের প্রেরণাদায়ক তারকার শেষ বিদায়

বার্দো ১৯৩৪ সালে প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। নাচে অসাধারণ দক্ষতার কারণে প্যারিসের মর্যাদাপূর্ণ কনজারভাতোয়ার ‘দ্য প্যারিসে ব্যালে’–এ ভর্তি হন।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ফরাসি সাময়িকী এল–এর প্রচ্ছদে স্থান পান, যা তাকে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৫২ সালে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

শুরুর দিকে ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘ডক্টর অ্যাট সি’–তে ডার্ক বোগার্ডের বিপরীতে অভিনয় করেন। তবে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ভাদিম পরিচালিত ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান’। এক অবাধ্য কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক তারকা হন।

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও গায়িকা ব্রিজিত বার্দো আজ ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় জ্যোতি ধরানো এই অভিনেত্রী ও সমাজকর্মীর জীবন শেষ হয়েছে আজ। চলচ্চিত্র জগৎ থেকে অবসর নেওয়ার পর বার্দোর জীবন নতুন মাত্রা পায়—তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন প্রাণী অধিকার আন্দোলনে। তবে পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

১৯৫৬ সালে রজার ভাদিম পরিচালিত ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান’ ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান বার্দো। ছবিতে তার অভিনয় দর্শকদের মন মাতিয়ে তোলে, আর একই সঙ্গে চলচ্চিত্র জগতে তার অবস্থান নিশ্চিত করে। পরবর্তী দুই দশক ধরে তিনি আবেদনময়ী অভিনেত্রী হিসেবে হাজারো তরুণের হৃদয়ে ঝড় তোলেন।

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বার্দো অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রাণী অধিকার নিয়ে তার সোচ্চার অবস্থান একপর্যায়ে বিতর্কিত দিক নিয়েছে। জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য ও ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী দল ফ্রন্ট ন্যাশনালের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে তাকে একাধিকবার বর্ণবিদ্বেষমূলক বক্তব্যের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

বার্দোর প্রভাব শুধুমাত্র সিনেমায় সীমিত ছিল না; তিনি হয়ে উঠেন চিন্তাবিদ ও শিল্পীদের প্রেরণা। ১৯৫৮ সালে প্যারিস-ম্যাচে তার উপর নিবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৯ সালে দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার লিখেন ‘ব্রিজিত বার্দো অ্যান দ্য ললিতা সিনড্রোম’—যাতে তাকে ফ্রান্সের সবচেয়ে মুক্তমনা নারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

ষাট ও সত্তরের দশকে বার্দো ফরাসি ও হলিউডের একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবিতে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সংগীতজগতে সক্রিয় ছিলেন এবং সের্জ গেইনসবুর্গের গান রেকর্ড করেন। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অভিনয় থেকে অবসর নেন এবং প্রধান মনোযোগ দেন প্রাণী সুরক্ষা আন্দোলনে। ১৯৭৭ সালে সিল শিকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন এবং ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন’।

বার্দোর জীবন ও কর্ম শুধুমাত্র চলচ্চিত্র এবং সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সামাজিক সচেতনতা, প্রাণী অধিকার এবং রাজনৈতিক বিতর্কেও তিনি নিজের ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণ চলচ্চিত্র ও সমাজকর্মের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিথী রাণী মণ্ডল/