নতুন বছরে নতুন রূপে তিন খান

ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা থাকে শুধু একটি সাল, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে সেগুলো থেকে যায় স্মৃতি হয়ে। বলিউডে ২০১৮ ছিল ঠিক তেমনই একটি বছর। সেই সময়কার কথা আজও বলিউডে ফিসফিস করে বলা হয়– যেন সেটা কোনো পরাজয়ের গল্প নয়, বরং এক ধরনের সতর্কবার্তা। ঠিক আট বছর পর ২০২৬ আবার ফিরে এসেছে প্রায় একই বিন্যাসে। তিনটি আলাদা সেট, আলাদা গল্প আর তিনটি একই নাম– শাহরুখ খান, আমির খান ও সালমান খান।

২০২৬ সালে বলিউডে তিন খানের সিনেমা মুক্তি নিয়ে আলোচনা থামছে না। কেউ বলছেন, সময়টা তিন খানের পক্ষে। কেউ বলছেন, সময়টাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ যেন এক সন্ধিক্ষণের বছর– যেখানে তিন খান তিন পথে হাঁটছেন। কেউ যুদ্ধের গল্পে, কেউ আধুনিক স্পাই ইউনিভার্সে, কেউ ইতিহাসের স্মৃতিচারণে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই– তারা কি ২০১৮-এর ছায়া পেরোতে পারবেন?

২০১৮ সালে দৃশ্যটা ছিল অন্যরকম। তখন বলিউড বিশ্বাস করত, তারকা মানেই নিরাপত্তা। বড় নাম থাকলে গল্প দুর্বল হলেও চলবে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘রেস ৩’, ‘জিরো’ আর ‘থাগস অব হিন্দুস্তান’ মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু সিনেমা হলে ঢুকে দর্শকরা বুঝে গিয়েছিলেন, এখন শুধু নাম যথেষ্ট নয়, গল্পও প্রয়োজন। ফলে তিনটি ছবিই বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়। সে বছর যেন প্রথমবারের মতো বলিউড আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখটা দেখেছিল।

এরপর বদলাতে শুরু করে বলিউড। ছোট বাজেটের ছবি আলোচনায় আসে, নতুন মুখেরা জায়গা করে নেয়। বড় তারকারাও বুঝতে শুরু করেন। তাদের আর শুধু তারকা ইমেজ দিয়েই চলবে না, গল্পের অংশ হতে হবে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সালমান খান ২০২৬ সালে বেছে নিয়েছেন ‘দ্য ব্যাটল অব গালওয়ান’, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়। এই সিনেমায় চেনা সালমানকে দেখা যাবে না। কারণ এখানে নেই চেনা স্টান্ট, নেই দর্শককে হাততালি দেওয়ার মতো সংলাপ। আছে বরফে ঢাকা সীমান্ত, আছে নিঃশব্দ লড়াই। সালমান খান এ সিনেমায় নিজের পুরোনো ইমেজের সঙ্গে লড়াই করছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এখন তিনি এমন গল্প করতে চান, যেগুলো তাঁর মনের ভেতর থেকে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে। ‘গালওয়ান’ সেই চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে।

শাহরুখ খানের গল্পটা আবার ভিন্ন। তিনিই সবচেয়ে দ্রুত বেরিয়ে এসেছেন ২০১৮-এর ক্ষত থেকে। ‘পাঠান’ আর ‘জওয়ান’ দিয়ে তিনি শুধু কামব্যাক করেননি, নিজের স্টারডমকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ‘কিং’ সেই ধারাবাহিকতার পরের ধাপ। এটি শুধু একটি স্পাই থ্রিলার নয়, এটি শাহরুখ খানের পুনর্দখলের ঘোষণা। বিভিন্ন সময়ে তিনি বলেছেন, এখন আর প্রমাণ করার কিছু নেই বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোনোটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর আমির খান। তিনি কখনোই ভিড়ের মধ্যে হাঁটেন না। ‘লাল সিং চাড্ডা’র পর তাঁর দীর্ঘ নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সেই নীরবতা ছিল চিন্তার। ‘হ্যাপি প্যাটেল খাতারনাক জাসুস’ ও ‘লাহোর ১৯৪৭’– এই দুটি প্রজেক্ট তাঁর প্রত্যাবর্তন হলেও, তা কোনো সরাসরি জবাব নয়; বরং নতুন প্রশ্নের সূচনা। এ দুই সিনেমায় তিনি সামনে থাকবেন কম, কিন্তু গল্পের দর্শনজুড়ে থাকবেন বেশি। এ সিনেমা দুটি প্রযোজনাও করেছেন তিনি। অতীতে আমির বহুবার বলেছেন, ইতিহাস ও সমাজের ক্ষত তাঁকে টানে। বিভাজনের গল্পে তাঁর যুক্ত হওয়াও তাই আকস্মিক নয়; এটি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহেরই সম্প্রসারণ।

শেষ পর্যন্ত বলিউডে সব হিসাব মেলে এক জায়গায়-গল্পে। সেই গল্পই ঠিক করে দেয়, এই তিন নামি তারকার অধ্যায় আরও দীর্ঘ হবে, নাকি নতুন কেউ ইতিহাস লিখবেন। ২০১৮-এর পর থেকে বলিউড বারবার ধাক্কা খেয়েছে। এরপর করোনা বন্ধ করে দিয়েছিল সিনেমা হল। তারপর শুরু হয় দক্ষিণী সিনেমার আধিপত্য বিস্তার। এখন ওটিটি দর্শকের অভ্যাস বদলে দিয়েছে। ফলে এখন আর সপ্তাহান্তের বক্স অফিসই শেষ কথা নয়। দর্শক এখন সিনেমার বিচার করে সময় নিয়ে। তুলনা করে, বিশ্লেষণ করে।

এই বদলে যাওয়া দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে তিন খান তিনটি ভিন্ন দর্শন তুলে ধরছেন। সালমান খান এখানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে। কারণ তাঁর স্টারডম দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করেছে পরিচিত ছাঁচের ওপর। নিজেও তিনি বহুবার স্বীকার করেছেন, দর্শক তাঁকে নির্দিষ্ট এক ধরনের নায়ক হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। ‘দ্য ব্যাটল অব গালওয়ান’ সেই অভ্যাস ভাঙার প্রচেষ্টা। এই ছবির মাধ্যমে সালমান যেন বলতে চাইছেন– তিনি শুধু তারকা নন, তিনি সময়ের দায়ও নিতে পারেন। সেটাই এ ছবির সবচেয়ে বড় বাজি। সফল হলে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। ব্যর্থ হলে প্রশ্ন উঠবে– দর্শক কি তাঁকে এই রূপে আসলেই দেখতে চায়? শাহরুখ খানের অবস্থান তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’ তাঁকে আবার শীর্ষে ফিরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। ‘কিং’-এর ক্ষেত্রে তাই প্রত্যাশার চাপ দ্বিগুণ।

আমির খান আবার সম্পূর্ণ আলাদা সমীকরণে খেলছেন। তাঁর জন্য বক্স অফিস সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু কখনোই একমাত্র লক্ষ্য নয়। ‘লাহোর ১৯৪৭’ সিনেমায় তিনি নিজের উপস্থিতিকে সীমিত রেখে গল্পকে সামনে আনতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সিনেমা শেষ হলে দর্শকের মনে প্রশ্ন থেকে যাক। এই ছবিও তাই বিনোদনের চেয়ে স্মৃতির ভার বহন করবে বেশি। কিন্তু এখনকার দর্শকের কি সেই ধৈর্য আছে?

তবে সিনেমাবোদ্ধারা মনে করছেন, ২০২৬-এর তিন খান যদি সত্যিই নিজেদের বদলে ফেলতে পারেন, তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত জয় হবে না– বলিউডের জন্যও হবে এক ধরনের পুনর্জন্ম। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো সরাসরি তিন খানের ভক্ত নয়, কিন্তু তারা জানে, এই তিন নামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ইন্ডাস্ট্রির গতিপথ। যদি এ ছবিগুলো সফল হয়, বলিউড আবার বড় বাজেট, বড় ক্যানভাসের গল্পে ফিরবে। যদি ব্যর্থ হয়, তবে আরও বেশি ঝুঁকবে ছোট গল্প, নতুন মুখ আর বিকল্প ধারার দিকে।

মাহমুদ সালেহীন খান