মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আর কঠোর বাণিজ্যনীতির প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করলেও চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি থামানো যায়নি। বিদায়ী বছরে দেশটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে বেইজিং।
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বার্ষিক উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করল, যা আগের বছরের ৯৯৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গত বছর চীনের মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাতবার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। এতে বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত উচ্চ শুল্ক সামগ্রিকভাবে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিতে পারেনি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কিছুটা কমেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে রপ্তানি বাড়িয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে চীন।
চীনের কাস্টমস প্রশাসনের উপপরিচালক ওয়াং জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এই সাফল্য এসেছে, যা সহজ ছিল না। তিনি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট পণ্য ও রোবোটিকস রপ্তানির প্রবৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পেছনে রয়েছে বিদেশি বাজারে চীনা পণ্যের বাড়তি চাহিদা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার হয়েছে। একই সময়ে দেশের ভেতরে আবাসন খাতের সংকট ও ঋণের চাপের কারণে ভোক্তা ব্যয় কমেছে, যা আমদানির প্রবৃদ্ধি সীমিত করেছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের আমদানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
এ ছাড়া দুর্বল ইউয়ান, পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর উচ্চ মূল্যস্ফীতি চীনা পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
হিনরিখ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ডেবোরা এলমস মনে করেন, এই বিপুল উদ্বৃত্ত চীনের জন্য আশীর্বাদ ও চ্যালেঞ্জ—দুটোই। একদিকে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশি বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ ও নজরদারিও বাড়ছে। তাঁর ধারণা, ২০২৬ সালেও চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে চীনের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ এখনো অনিশ্চিত। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ অভিযোগ তুলেছে, কম দামের চীনা পণ্যে তাদের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ৯০টির বেশি দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে চীনের ওপর। বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশও পাল্টা শুল্কের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তখন শতভাগের বেশি শুল্ক আরোপের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
পরবর্তীতে গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর দুই দেশের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। এতে সম্পূর্ণ বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি কমলেও, কিছু পণ্যে মাঝারি শুল্ক এখনো বহাল থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
-আফরিনা সুলতানা/










