গাজার অন্তর্বর্তী সরকার দেখভাল করবে ‘বোর্ড অব পিস’, যার চেয়ারম্যান ট্রাম্প

গাজার খান ইউনিসে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু শিবির

গাজা উপত্যকার শাসনকাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর প্রাক্কালে তিনি গাজা পরিচালনার জন্য আলি শাথের নেতৃত্বে একটি ‘টেকনোক্র্যাট সরকারকে’ প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে ট্রাম্পের নিজস্ব পরিকল্পনায় গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদের অধীনে।

মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় গঠিত এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (NCAG)। এর নেতৃত্বে থাকছেন আলি শাথ, যিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক সহকারী মন্ত্রী এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তাকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে ‘কারিগরি বিশেষজ্ঞ’ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৫ সদস্যের এই কমিটি গাজার বেসামরিক প্রশাসনিক কাজ এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার তদারকি করবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এই প্রক্রিয়ার তদারকিতে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই বোর্ড গাজায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণে কাজ করবে। তবে বিশ্বজুড়ে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই কাঠামোকে আধুনিক যুগের ‘উপনিবেশবাদী কাঠামোর’ সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, একটি স্বাধীন ভূখণ্ডকে ভিনদেশি নেতার অধীনে পরিচালিত বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে রাখা ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসনের ধারণার পরিপন্থী।

গত বছর অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। এই ধাপের মূল লক্ষ্য হলো। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো সংকটময়। যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি এবং ইসরায়েল কর্তৃক মিশর সীমান্ত খোলার বিলম্ব এই পরিকল্পনাকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

গত দুই বছরের যুদ্ধে গাজায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজার বর্তমান অবস্থাকে ‘গণহত্যা’ ও চরম মানবিক বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছে। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে টেকনোক্র্যাট সরকারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা কতটা আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আলি শাথ গাজার ধ্বংসাবশেষ সাগরে ফেলে নতুন ভূমি তৈরির মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা বললেও, কয়েক দশকের ক্ষত সারিয়ে তোলা এই নতুন প্রশাসনের জন্য হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘মাস্টার প্ল্যান’ গাজাকে হামাসের শাসন থেকে মুক্ত করে এক নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, এই সমাধান কি ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, নাকি এটি কেবল ওয়াশিংটনের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন রূপ? বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আলি শাথের এই টেকনোক্র্যাট সরকার এবং ট্রাম্পের ‘পিস বোর্ড’ গাজার ধ্বংসস্তূপে শান্তির প্রদীপ জ্বালাতে পারে কি না, তা দেখার জন্য।

-এম. এইচ. মামুন