কৃষিতে আশা জাগাচ্ছে উন্নতজাতের বারি সরিষা-২০। জাতটির জীবনকাল স্বল্প হওয়ায় দ্রুতই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। এছাড়া রয়েছে উচ্চফলন, খরা এবং লবণাক্ততা সহনশীলতাও। কৃষকদের মধ্যে জাতটি ছড়িয়ে দিতে ইতোমধ্যে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আমন ধান কাটার পর বোরো ধানের আগের স্বল্প সময়ে পতিত পড়ে থাকা জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে সিরাজগঞ্জে ১০০ বিঘা জমিতে দেয়া হয়েছে এই জাতের সরিষার প্রদর্শনী। বারি সরিষা-২০ চাষে চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭ বেশি জনপ্রিয়, যেগুলোতে প্রতি বিঘায় গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ ফলন হয়। তবে এসব জাতের চেয়েও বারি সরিষা-২০-এর ফলন বেশি, যা সাত থেকে আট মণ পর্যন্ত হতে পারে। জীবনকাল বারি-১৪ ও ১৭-এর কাছাকাছি হলেও বারি-২০ খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল, যা চরাঞ্চলের জন্য বড় সুবিধা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের যমুনার চর পূর্ব মোহনপুর গ্রামে পার্টনার প্রকল্পের সহায়তায় একত্রে ১০০ বিঘা জমিতে উন্নতজাতের বারি সরিষা-২০-এর আবাদ করেছেন ৩৫ জন কৃষক। চরাঞ্চলের যে জমিগুলো বছরের বড় একটি সময় পতিত থাকে, সেসব জমি উৎপাদনের আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
এই প্রদর্শনীর কৃষক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘এখানে প্রায় ১০০ বিঘা জমির মধ্যে আমার সাড়ে তিন বিঘা জমি আছে। আগে এই জমিটা পতিত থাকত। এবার বারি সবিষা-২০ চাষ করেছি। ফসল তুলে সাথে সাথে বোরো ধান লাগাব। কম সময়ে ভালো ফলন হলে আমাদের জন্য বড় সুবিধা হবে।’ তার মতো আরো অনেক কৃষকই নতুন জাতের সরিষা দেখে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের পাবনা কার্যালয়ের সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরাজুল ইসলাম জানান, বারি সরিষা-২০ একটি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল জাত। যমুনা নদীর চরে পার্টনার প্রকল্পের (বারি অঙ্গ) আওতায় এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পাইলট প্রডাকশন হিসেবে ১০০ বিঘা জমিতে কৃষকদের সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই এই সরিষা হার্ভেস্ট করা যাবে। হার্ভেস্টের পরপরই বোরো ধান চাষে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে একই জমিতে তিন ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত টনি-৭ জাতের তুলনায় বারি সরিষা-২০-এর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হবে বলে আশা করছেন গবেষকরা। সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন পাওয়া যাবে, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু ফলনই নয়, তেলের পরিমাণও বেশি হবে এই জাতে। ফলে কৃষক যেমন ভালো দাম পাবেন, তেমনি দেশের তেল জাতীয় ফসলের ঘাটতি পূরণেও এটি ভূমিকা রাখবে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২০০ হেক্টর আবাদ বেড়েছে। আমন ধান কাটার পর বোরো ধান চাষের মাঝের যে স্বল্প সময় থাকে, সেই সময়েই সাধারণত সরিষা চাষ হয়। বারি সরিষা-২০ এই স্বল্প সময়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি প্রথমবারের মতো মাঠপর্যায়ে বড় আকারে চাষ হচ্ছে। বিরাজমান জাতগুলোর তুলনায় এটি অধিক উচ্চফলনশীল। বারি সরিষা-১৪-এর তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন হবে বারি সরিষা ২০-এ। তেলের পরিমাণও বেশি। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রায় নেই বললেই চলে। জীবনকালও অন্যান্য জাতের তুলনায় কম হওয়ায় কৃষকরা এটি দ্রুত গ্রহণ করছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুরে মওলা বলেন, বাংলাদেশে সিরাজগঞ্জ জেলার পরিচিতি একক ফসল হিসেবে সরিষা। আমরা চাই এই জেলার সরিষা চাষ আরো এগিয়ে যাক। সেই ধারাবাহিকতায় বারি উদ্ভাবিত নতুন জাত বারি সরিষা-২০ এক জায়গায় ১০০ বিঘা জমিতে চাষ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো রোপা আমন কাটার পর যে সময়টা জমি পতিত থাকে, সেই সময়ে সরিষা আবাদ করা। সরিষার পাশাপাশি মৌ চাষেও সিরাজগঞ্জ এগিয়ে রয়েছে। আমরা সেই চাষকে আরো সমৃদ্ধ করতে চাই এবং পরবর্তী সময়ে নির্বিঘ্নে বোরো ধান আবাদ নিশ্চিত করতে চাই। যদি আমরা এক জমিতে তিনটি ফসল করতে পারি তাহলে কৃষি আরো সমৃদ্ধ হবে।
এদিকে পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশে বছরে ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। আমদানির মাধ্যমে বাকি তেলের চাহিদা মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আমরা চাই সরিষা চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে। যে কারণে উন্নত জাতের চাষাবাদ প্রয়োজন। সে চিন্তা থেকে পার্টনার প্রকল্প থেকে এবার সারাদেশে ৬৫৭টি সরিষার প্রদর্শনী দিয়েছে। এর মধ্যে বারি-২০ এর নতুন নতুন প্রদর্শনী যুক্ত করা হয়েছে। এই জাতের এই সরিষা ইতোমধ্যেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছে চাষিদের মধ্যে।
বায়েজীদ মুন্সী, সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে










