বাংলাদেশে গৃহঋণ বা হোম লোন শুধু আবাসন খাতের উন্নয়ন নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে। নতুন বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহঋণের সীমা বাড়িয়ে একটি চমৎকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। রাজধানীর ফ্ল্যাটের দাম ও নির্মাণ খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন ঋণের সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ফ্ল্যাট কিনতে বা বাড়ি তৈরি করতে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। আগে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারত। ফলে আবাসন খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়বে। ৬ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে আবাসন ঋণের এই সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বছরের সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। এর মধ্যে ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬টি ব্যাংকের। ব্যাংকগুলো হলো সিটিজেন্স ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে এই ব্যাংকগুলো ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।
এ ছাড়া ৫ থেকে ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংক ১১টি। সেগুলো হলো মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী, এনসিসি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো আবাসন খাতে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। অন্য সব ব্যাংক আগের মতো ২ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো ফ্ল্যাটের দাম যদি হয় ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা, তখন ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ আছে এমন ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকার ঋণ নিতে পারবেন ভোক্তারা।
আবাসন ঋণের সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা। এক বিজ্ঞপ্তিতে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থবির আবাসন খাতকে গতিশীল করতে নানা চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধিত প্রজ্ঞাপন এরই মধ্যে জারি করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক আবাসন খাতের ঋণের সীমা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ জানাই।’
আবাসন উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা বাড়ানোর ফলে ব্যক্তি অথবা পরিবার যাঁরা নতুন বাড়ি, ফ্ল্যাট বা আবাসন প্রকল্প কিনতে চান, তাঁরা বেশি ঋণ পাবেন। তাতে আবাসন খাতের চাহিদা বাড়বে।
গৃহঋণ বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে দেশের অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গৃহঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি এই ঋণে পরিশোধের সময়সীমাও বাড়ানো দরকার। যাতে করে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরা ঋণ নিতে পারেন। একজন চাকরিজীবী বা মধ্যবিত্ত যদি বাড়িভাড়া বা তার চেয়ে কিছু বেশি টাকা মাসিক কিস্তিতে গৃহঋণ নিতে পারেন তাহলে একদিকে যেমন তিনি স্বস্তি পাবেন তেমনি আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। পৃথিবীর সব দেশেই গৃহঋণ পাওয়া যায় সহজ শর্তে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি পরিশোধ সুবিধায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে গৃহঋণের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে গৃহঋণ বাড়লে শুধু আবাসন খাত নয়, এর সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০০টি খাত বিকশিত হয়। আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, রড, সিমেন্ট, বালু, রং, কাঠ, আসবাব ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্প খাত। তা ছাড়া গৃহঋণ ঝুঁকিহীন। এই ঋণ গ্রহীতারা অস্তিত্বের প্রয়োজনে খেলাপি হন না। খেলাপি হলেও ব্যাংক সহজেই টাকা উদ্ধার করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে দেশের অর্থনীতি।










