আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) সক্ষমতা বাড়াতে নতুন চারটি জাহাজ কেনার প্রকল্প গভীর সংকটে পড়েছে। চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি অনুমোদনের ৩২ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো সম্পন্ন হয়নি ঋণচুক্তি। প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে হাতে সময় আছে মাত্র দুই মাস, অথচ চীনের দেওয়া ‘কঠিন শর্তের’ বেড়াজালে থমকে আছে ঋণ প্রাপ্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীন এই ঋণের বিনিময়ে দুটি নজিরবিহীন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো দুর্নীতি হলে তার বিচার হতে হবে চীনের আদালতে—যেখানে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বিচার করার অধিকারও চায় চীন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সরকার (ইআরডি) এই ঋণ নিয়ে বিএসসিকে কীভাবে দিচ্ছে, সেই অভ্যন্তরীণ চুক্তির বিস্তারিত আগে মূল্যায়ন করতে চায় তারা। মূলত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই দুই শর্তে রাজি হতে চাচ্ছে না। ফলে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করবে, কিন্তু ঋণচুক্তি করা ইআরডির (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) কাজ। ৩২ মাসেও কেন ঋণচুক্তি হলো না, তা ইআরডি ভালো বলতে পারবে।”
তবে ইআরডির কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সামনে নির্বাচন থাকায় বড় কোনো ঝুঁকি নিয়ে সরকার এই অসম শর্তে স্বাক্ষর করতে আগ্রহী নয়।
২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পের আওতায় দুটি ক্রুড ওয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহের কথা রয়েছে। ওই বছরই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হলেও ঋণের অভাবে কাজ শুরু করা যায়নি। গত ২৩ ডিসেম্বর নৌপরিবহন সচিব নূরুন্নাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, কারণ ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে এই কাজ শেষ হওয়া অসম্ভব।
বর্তমানে বিএসসির বহরে মাত্র সাতটি জাহাজ রয়েছে। অতীতে ৩৬টি জাহাজ অকেজো হওয়ায় বহর ছোট হয়ে আসে। এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ হারানো এবং অগ্নিকাণ্ডে দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে দুটি জাহাজ কেনা হলেও সরকারি এই বড় প্রকল্পটি আটকে থাকায় বহর সম্প্রসারণের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, চীনের বর্তমান মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে তারা এই মুহূর্তে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে শর্তগুলো শিথিল হতে পারে বলে অনেকে আশা প্রকাশ করছেন।