গ্যালারি বনাম অ্যালবাম, স্মৃতি কাগজেই নিরাপদ

Photo album cartoon vector illustration with human hand holding pencil for writing explanation under photograph in scrapbook page

আমাদের ফোনের গ্যালারিতে এখন হাজার হাজার ছবি। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে বিকালের সূর্যাস্ত— সবই আমরা ক্যামেরাবন্দি করি। কিন্তু সত্যি করে বলুন তো, শেষ কবে মন দিয়ে সেই ছবিগুলো দেখেছেন? ফোনের মেমোরি ফুল হলে বা ফোন হারিয়ে গেলে নিমিষেই মুছে যায় আমাদের বছরের পর বছর জমানো সব স্মৃতি। এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে এবং আবেগের সত্যিকারের পরশ পেতে মানুষ এখন আবারও ফিরে যাচ্ছে সেই চিরচেনা ‘ফটো অ্যালবামে’।

স্পর্শের অনুভূতি ও দেখার ভিন্ন আনন্দ: ডিজিটাল স্ক্রিনে ছবি দেখা আর হাতে ধরা অ্যালবামের পাতা ওল্টানোর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ফোনের স্ক্রিনে আমরা দ্রুত সোয়াইপ করে যাই, কিন্তু অ্যালবামের প্রতিটি পাতা ওল্টানোর সময় আমাদের মস্তিষ্ক সেই মুহূর্তটিকে অনুভব করার সময় পায়। প্রিন্ট করা ছবির একটা আলাদা ওজন আছে, কাগজের একটা বিশেষ ঘ্রাণ আছে, যা কোনো ডিজিটাল ফাইলে পাওয়া অসম্ভব। একটি অ্যালবাম হাতে নেওয়া মানে ইতিহাসের একটি খণ্ডকে স্পর্শ করা।

যান্ত্রিকতা থেকে স্মৃতির মুক্তি: প্রযুক্তি আমাদের কাজ সহজ করলেও স্মৃতিকে করেছে অস্থায়ী। মেমোরি কার্ড নষ্ট হওয়া, ফোন চুরি হওয়া বা ভুলবশত ডিলিট হয়ে যাওয়ার ভয় সবসময়ই থাকে। অন্যদিকে, একটি ভালো মানের ফটো অ্যালবাম দশকের পর দশক টিকে থাকে। ২০ বছর আগের একটি ঝাপসা হয়ে আসা ছবিও যে পরিমাণ আবেগ জাগিয়ে তোলে, ক্লাউড স্টোরেজে থাকা ঝকঝকে হাজারো ছবিও তা পারে না। অ্যালবাম হলো স্মৃতির একটি নিরাপদ ‘হার্ড কপি’।

ঘরোয়া আড্ডার নতুন প্রাণভ্রমরা: সেই সোনালি দিনগুলোর কথা ভাবুন তো, যখন ড্রয়িংরুমে মেহমান এলে আড্ডার এক ফাঁকে হাতে তুলে দেওয়া হতো পারিবারিক অ্যালবাম। সেই সাদাকালো বা রঙিন ছবিগুলো দেখে চলতো হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রূপ আর নস্টালজিক স্মৃতিচারণ। এখন সবাই ড্রয়িংরুমে বসেও যার যার ফোন নিয়ে ব্যস্ত। এই যান্ত্রিক আড্ডায় প্রাণ ফিরিয়ে আনতে একটি সুন্দর সাজানো অ্যালবাম ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে। এটি কেবল একটি বই নয়, বরং পরিবারের কয়েক প্রজন্মের যোগসূত্র।

প্রতিটি ছবির পেছনের অসম্পূর্ণ গল্প: সব ছবি কি আর নিখুঁত হয়? ডিজিটাল গ্যালারিতে আমরা সবসময় ‘পারফেক্ট’ ছবি খুঁজি। একটু খারাপ হলে তা ডিলিট করে দিই। কিন্তু অ্যালবামে স্থান পায় সেইসব ছবিও যেগুলোতে হয়তো কারো চোখ বন্ধ, কেউ হয়তো হাসতে হাসতে হেলে পড়েছে, কিংবা কোনো ছবি হয়তো একটু ঝাপসা। এই ‘অপারফেক্ট’ ছবিগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অকৃত্রিম আনন্দ আর সত্যি গল্প। অ্যালবামে আমরা ছবি খুঁজি না, আমরা খুঁজি ফেলে আসা দিনগুলোর সেই মুহূর্তকে।

উপহার হিসেবে অনন্য এক আবেদন: প্রিয়জনের জন্মদিনে বা বিবাহবার্ষিকীতে এখন আমরা দামি স্মার্টফোন বা গ্যাজেট উপহার দিই; কিন্তু ভেবে দেখুন তো, আপনাদের কাটানো সেরা মুহূর্তগুলো দিয়ে নিজের হাতে সাজানো একটি ‘ফটো বুক’ বা ‘স্ক্র্যাপবুক’ উপহার দেওয়ার কথা! এর আবেদন যেকোনো দামি উপহারের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। ছবির পাশে ছোট করে লিখে রাখা একটি চিরকুট বা তারিখ সেই উপহারকে করে তোলে অমূল্য এবং ব্যক্তিগত।

ছোটদের জন্য শেকড়ের সন্ধান: বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা বেড়ে উঠছে ডিজিটাল স্ক্রিনের হাত ধরে। তাদের কাছে মা-বাবার ছোটবেলা বা দাদাবাড়ির স্মৃতিগুলো কেবলই গল্প। একটি ফটো অ্যালবাম তাদের সামনে সেই ফেলে আসা দিনগুলোর বাস্তব ছবি তুলে ধরে। তারা চিনতে শেখে তাদের পূর্বপুরুষদের, বুঝতে পারে পরিবারের ঐতিহ্য।

স্মৃতির অ্যালবাম সাজাবেন কীভাবে?

ফোনের হাজার ছবির মধ্য থেকে প্রতি মাসের সেরা ৫-১০টি ছবি আলাদা করুন।  আজকাল অনলাইনেও ছবি প্রিন্ট করার অর্ডার দেওয়া যায়। মাসে অন্তত একবার ছবি প্রিন্ট করার অভ্যাস করুন। অ্যালবামের ছবির পাশে ছোট করে লিখে রাখুন স্থান, তারিখ এবং সেই দিনের একটি বিশেষ স্মৃতি। বিয়ের জন্য আলাদা, সন্তানের বড় হওয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা এবং ভ্রমণের জন্য আলাদা অ্যালবাম তৈরি করতে পারেন।

প্রযুক্তি আমাদের গতি দিয়েছে, কিন্তু স্মৃতিকে করেছে যান্ত্রিক। জীবনকে একবার থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে দেখার জন্য ফটো অ্যালবামের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর নেই। তাই আজই আপনার ফোনের সেরা ছবিগুলো বের করে ফেলুন, সাজিয়ে তুলুন জীবনের গল্পগুলোকে কাগজের পাতায়।

-সানা