পবিত্র মাহে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং এটি আত্মিক ও শারীরিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ মাসটি ধৈর্য, সংযম এবং নিয়মানুবর্তিতা শেখার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। একজন মানুষ তার দীর্ঘদিনের লালিত মন্দ অভ্যাস, বিশেষ করে ধূমপান ও বিশৃঙ্খল জীবনধারা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রমজানকে সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী অনুযায়ী রোজা কেবল উপবাস নয়, বরং এটি একটি ঢাল। হাদিসে এসেছে:
“রোজা হচ্ছে (জাহান্নামের আগুন ও পাপ থেকে বাঁচার) ঢাল। তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।” (সহিহ বুখারি)
ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর এবং একটি আসক্তি। রমজানে একজন রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রায় ১৪-১৫ ঘণ্টা সব ধরনের পানাহার ও ধূমপান থেকে বিরত থাকেন। এই দীর্ঘ সময় ইচ্ছাশক্তির জোরে ধূমপানমুক্ত থাকা প্রমাণ করে যে, মানুষ চাইলেই এই বিষাক্ত অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে। ইফতারের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়েও যদি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা যায়, তবে এক মাসের এই অভ্যাস স্থায়ীভাবে ধূমপান ছাড়তে সহায়ক হয়। মূলত রমজান ধূমপায়ীদের ফুসফুসকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং নিকোটিনের আসক্তি ভাঙার একটি স্বর্গীয় সুযোগ। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় বলেন,
“তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)
এছাড়া আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আরও বলেন,
“তিনি (রাসূল) তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ তাদের ওপর হারাম করেন।” (সূরা আরাফ: ১৫৭)
আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)
রমজান শুধু খাবার ত্যাগের নাম নয়, বরং চোখ, কান, জিহ্বা এবং মনের রোজা রাখার নাম। মিথ্যা বলা, গিবত (পরনিন্দা) করা, অশ্লীলতা, ক্রোধ এবং ঝগড়া-বিবাদের মতো মানসিক ব্যাধিগুলো থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ রয়েছে এ মাসে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” এই আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতা একজন মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করে এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
রমজান মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে এক আমূল পরিবর্তন ও শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। সেহরি, ইফতার এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দিষ্ট সময়সূচী মেনে চলার ফলে একজন মানুষের জীবনে সময়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ভোররাতে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে তারাবির মাধ্যমে ইবাদতে মগ্ন হওয়া অলসতা দূর করে শরীর ও মনকে সজাগ রাখে। এই নিয়মানুবর্তিতা রমজানের পরেও বজায় রাখলে একটি সুশৃঙ্খল জীবন গঠন করা সহজ হয়।
রমজান আমাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখায়। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের ওপর থাকবে, যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে।” (সহিহ বুখারি)
এই নির্দিষ্ট সময়জ্ঞান মানুষের বিশৃঙ্খল জীবনকে শৃঙ্খলার ছকে নিয়ে আসে।
রমজান আমাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখায়। হাদিসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং সময়মতো সেহরি ও ইফতারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের ওপর থাকবে, যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে।” (সহিহ বুখারি)
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, রোজা বা ‘অটোফেজি’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন) বের হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে পাকস্থলী বিশ্রাম পায় এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়। পাশাপাশি, আত্মনিয়ন্ত্রণের ফলে মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়, যা ডিপ্রেশন বা দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। একটি সুস্থ শরীর ও শান্ত মনই হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের মূল ভিত্তি।
পরিশেষে বলা যায়, মাহে রমজান হলো পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতার পথে ফেরার এক মহাসড়ক। দীর্ঘ এক মাসের সাধনা যদি কেবল লোক দেখানো না হয়ে প্রকৃত অন্তরের পরিবর্তন হয়, তবে ধূমপানের মতো মরণনেশা এবং সব ধরনের অনাচার ত্যাগ করা সম্ভব। রমজানের এই শিক্ষা যদি বছরের বাকি ১১ মাস ধরে রাখা যায়, তবেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে একটি সত্যিকারের সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক পরিবেশ তৈরি হবে। তাই আসুন, এই রমজান হোক আমাদের বদভ্যাস ত্যাগের এবং একটি নতুন সূচনার শপথ।
-মামুন










