ভেনেজুয়েলার অপসারিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে আটকের পর নিউইয়র্কের আদালতে তোলা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ‘যুদ্ধবন্দি’ হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন। মাদুরোর এই দাবি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা পাওয়ার এক গভীর কৌশলগত লক্ষ্য।
সোমবার নিউইয়র্কের আদালতে দোভাষীর মাধ্যমে মাদুরো বলেন, “আমি কোনো অপরাধী নই। আমি একজন ভদ্র মানুষ এবং আমি এখনো আমার দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট।” তিনি নিজেকে মার্কিন আগ্রাসনের শিকার দাবি করে বলেন, তাঁকে একটি সশস্ত্র সংঘর্ষের মাধ্যমে আটক করা হয়েছে, যা তাঁকে ‘যুদ্ধবন্দি’র মর্যাদা দেয়।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, একজন যুদ্ধবন্দি বিশেষ কিছু সুরক্ষা পান যা সাধারণ কয়েদিরা পান না- অনুচ্ছেদ ১৭ অনুযায়ী, নাম, পদবি ও জন্ম তারিখের বাইরে তিনি কোনো তথ্য দিতে বাধ্য নন। অনুচ্ছেদ ১৩ ও ১৪ অনুযায়ী, তাঁকে কোনো শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা অপমানজনক আচরণ করা যাবে না। আটককারী রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র) তাঁর আবাসন, পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বাধ্য। জেনেভা কনভেনশন ও রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৮ অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দিকে ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত করা একটি যুদ্ধাপরাধ।
মাদুরোর এই দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যকার সংঘাতের প্রকৃতি নিয়ে এক বড় আইনি বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এটি কোনো যুদ্ধ নয়, বরং একটি ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা অভিযান’। মাদুরো একজন অভিযুক্ত ‘নার্কো-টেররিস্ট’ বা মাদক সম্রাট, যাঁর বিরুদ্ধে আদালতের পরোয়ানা ছিল। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন ও ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যানের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল দখল এবং একটি সার্বভৌম দেশের সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করাই প্রমাণ করে যে এটি একটি যুদ্ধাবস্থা। মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচারের অভিযোগকে সামনে রেখে একটি বিদেশি সরকারকে সামরিকভাবে উৎখাত করার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
যদি মাদুরোকে ‘যুদ্ধবন্দি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে মার্কিন আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধে (মাদক পাচার) বিচার করতে সমস্যায় পড়বে। কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দিদের কেবল যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা যায়।
মাদুরোকে আটকের এই ঘটনা যেমন একদিকে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তেমনি এটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞাকেও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
-এম. এইচ. মামুন










