আসন সমঝোতার টানাপোড়েনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দূরত্ব

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতসহ অন্যান্য সমমনা ১১ দলের বৃহত্তর জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। বিশেষ করে প্রধান দুই শরিক জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে এখন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তৎপরতা শুরু করেছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি হওয়ায় এর আগেই একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে জোটভুক্ত দলগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জোটের আলোচনার শুরুতে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তুলেছিল। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও এলডিপি জোটে নতুন করে যুক্ত হওয়ায় সমীকরণ বদলে গেছে। জামায়াত এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে ইসলামী আন্দোলনের একটি বড় অংশ। তাদের অভিযোগ, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন না করে নতুন দলগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, তাদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও সমঝোতায় তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ইসলামী আন্দোলন কেন জামায়াতের কাছে আসন চাইবে?” অন্যদিকে, জামায়াত নেতাদের দাবি, ইসলামী আন্দোলন ৭০-৭৫টি আসন চাইছে যা বাস্তবসম্মত নয়। এর পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ‘ইন্ধন’ বা ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জোটের শরিকরা সমঝোতার তোয়াক্কা না করেই নিজ নিজ শক্তি প্রদর্শনে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দিয়েছে- ২৭৬টি আসনে, ইসলামী আন্দোলন দিয়েছে ২৬৮টি আসনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দিয়েছে ৯৪টি আসনে, এবি পার্টি দিয়েছে ৫৩টি আসনে এবং এনসিপি ৪৪টি আসনে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা গেছে। আশা করছি আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে আলোচনা একটি যৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে।”

দলীয় সূত্র মতে, জামায়াত প্রাথমিকভাবে ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫-৪০টি এবং এনসিপিকে ৩০টি আসন ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টিকেও সীমিত সংখ্যক আসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবের পর ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার প্রতিফলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা গেছে। এমনকি তারা এক পর্যায়ে সমঝোতা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছিল।

তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমার আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।

সার্বিক বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, “ইসলাম, দেশ এবং মানবতার স্বার্থেই আমরা সমঝোতা করব। তবে এই তিনটি বিষয় ব্যাহত হলে আমরা পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হব।”

নতুন করে জোটে আসা এনসিপি ও এবি পার্টি শুরুতে ৫০টি করে আসন চাইলেও বর্তমানে তারা অনেকটাই অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এনসিপিকে ৩০টি আসনের মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও ওইসব আসনে জামায়াত প্রার্থীরা এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে শেষ মুহূর্তে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি না হলে নির্বাচনী মাঠে জোটের ঐক্য ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।

-এম. এইচ. মামুন