সাড়ে ৪৬ ডলার বনাম সাড়ে ৪ কোটি ডলার: ভারতের কোয়ান্টাম প্রকল্পকে হারাল ড্যাফোডিলের নোহান

বিশ্বজুড়ে যখন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং মানেই ধরা হয় শত কোটি ডলারের ল্যাবরেটরি আর বিশালাকার হার্ডওয়্যার, তখন মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা (৪৬ ডলার) ব্যয়ে তৈরি একটি এআই মডেল দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবক ওয়ালিউল ইসলাম নোহান। তার এই উদ্ভাবন ভারতের সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার জাতীয় কোয়ান্টাম প্রকল্পকেও দক্ষতার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর নেপালের কাঠমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন ‘আন্তর্জাতিক এসডিজি চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৫’ এ নোহানের এই গবেষণা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি লাভ করে।
উদ্ভাবনের নেপথ্যে: সফটওয়্যার যখন হার্ডওয়্যারের বিকল্প
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নোহান তার গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, কীভাবে দামি হার্ডওয়্যার ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কোয়ান্টাম সার্কিট সিমুলেশন সম্ভব। তার গবেষণার শিরোনাম ছিল:

“$46 AI Model Beats $46M Quantum Project of India: An AI-Driven Scalable Quantum Circuit Simulation Framework Capable of Emulating 100+ Qubits”

নোহানের তৈরি এই এআই ফ্রেমওয়ার্কটি ১০০-এর বেশি ‘কিউবিট’ (Qubit) অনুকরণ করতে সক্ষম, যা শোরের অ্যালগরিদম ও কোয়ান্টাম ফেজ এস্টিমেশনের মতো জটিল প্রক্রিয়াগুলো অনায়াসেই চালাতে পারে। যেখানে সাধারণ কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে বিপুল বিদ্যুৎ ও অর্থের প্রয়োজন হয়, সেখানে এই মডেলটি অত্যন্ত কম খরচে এবং কম শক্তিতে একই ধরনের ফল দিতে সক্ষম।
সীমাবদ্ধতা থেকে জন্ম নিল সম্ভাবনা
নোহান জানান, কোনো প্রতিযোগিতার জন্য নয় বরং নিজের প্রয়োজন থেকেই এই গবেষণার শুরু। মলিকুলার বায়োলজি ও পদার্থবিজ্ঞানের জটিল ডেটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তিনি বিকল্প হিসেবে এআইকে বেছে নেন।
নোহান বলেন, “আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে, যদি আমরা দক্ষতার দিকে মনোযোগ দিই, তবে বুদ্ধিমান সিস্টেম কতটা সাশ্রয়ী হতে পারে। এটি বাস্তব কোয়ান্টাম প্রসেসরের বিকল্প না হলেও গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক সমাধান।”
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা
নোহানের এই ‘কম দিয়ে বেশি করা’ দর্শন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে স্পর্শ করেছে:
এসডিজি ৪: গুণগত শিক্ষা
এসডিজি ৯: শিল্প ও উদ্ভাবন
এসডিজি ১০: অসমতা হ্রাস
এসডিজি ১৩: জলবায়ু সচেতনতা
কে এই নোহান?
যশোরের শালিখা উপজেলার সন্তান ওয়ালিউল ইসলাম নোহান বর্তমানে ‘আলাদিন এআই’ এর লিড টেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও মাহমুদা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে নোহান ছাত্রজীবন থেকেই উদ্ভাবনী কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর আগে তিনি নাসা স্পেস চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় রোবোটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপেও নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
বিনিয়োগের আহ্বান
দেশের আইটি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নোহান বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণাভিত্তিক স্টার্টআপে বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। যদি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসেন, তবে বাংলাদেশ আইটি সার্ভিসের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানের নিজস্ব প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারবে। এআই ব্যবহার করে দেশের ৯০ শতাংশ কাজ আরও দক্ষভাবে করা সম্ভব।”
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে যে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব, নোহান আজ তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

-লামিয়া আক্তার