২০২৬ বিশ্বকাপের আগে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ফুটবল প্রশাসন। অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এখন দেশজুড়ে তদন্ত ও রাজনৈতিক চাপের মুখে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চে। আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফুটবলার কার্লোস তেভেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইঙ্গিত দেন, বুয়েনস আইরেসের উপকণ্ঠের পিলার এলাকায় রহস্যজনক কর্মকাণ্ড চলছে। তার দাবি, এএফএর কোষাধ্যক্ষ নিয়মিত ওই এলাকায় যাতায়াত করতেন এবং সেখানে বস্তাভর্তি টাকা পুঁতে রাখা ও দুষ্প্রাপ্য পুরোনো গাড়ির সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছে।
তেভেজের এই পোস্টের পর প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল কোয়ালিসিওন সিভিকা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং পিলারের একটি বিলাসবহুল ভিলাকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এই ভিলাটি অর্থ পাচারের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
গত ডিসেম্বরের শুরুতে আর্জেন্টিনার পুলিশ অর্থ পাচার তদন্তের অংশ হিসেবে এএফএ সদর দপ্তর ও এক ডজনের বেশি ফুটবল ক্লাবে অভিযান চালায়। ক্লাবগুলোর আর্থিক লেনদেন এবং একটি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রবাহ খতিয়ে দেখা হয়। এর তিন দিন পর পিলারের সেই ভিলায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ একটি হেলিপোর্ট, আস্তাবল এবং ফেরারি ও পোরশেসহ মোট ৫৪টি বিলাসবহুল গাড়ির সন্ধান পায়।
কোয়ালিসিওন সিভিকার অভিযোগ অনুযায়ী, এই সম্পত্তিটি এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া ও কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনোর সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থ পাচার চক্র আড়াল করতে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে আরেক মামলায় আর্জেন্টিনার কর কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, তাপিয়া, তোভিগিনো ও অন্যান্য কর্মকর্তারা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার অবৈধভাবে গোপন রেখেছেন।
যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে এএফএ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে এক বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলাই সরকারের রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার। সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন অলাভজনক কাঠামোয় পরিচালিত ফুটবল ক্লাবগুলোকে লাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ এএফএর।
২০১৭ সালে তাপিয়া সভাপতি হওয়ার পর ২০২২ বিশ্বকাপসহ একাধিক শিরোপা জয়ের কথা উল্লেখ করে এএফএ বলেছে, মাঠের সাফল্যের দিক থেকে তারা ‘সঠিক পথেই আছে’। তবে আর্জেন্টিনার ক্রীড়া সাংবাদিক নেস্টর সেন্ট্রার ভাষায়, ‘এখানে যেন দুটি এএফএ একটি আন্তর্জাতিক সাফল্যের, আরেকটি দেশের ভেতরের অস্থিরতার।’
তদন্তকারীরা জানান, ভিলাটিতে কর্মরত প্রায় ১০ জন কর্মচারীর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে যে তাপিয়া ও তোভিগিনো সেখানে মালিকের মতোই চলাফেরা করতেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, অভিযানের সময় এএফএর লোগো ও তোভিগিনোর নামসংবলিত একটি ব্যাগ, ফুটবলবিষয়ক বই এবং সম্মাননা ফলকও উদ্ধার করা হয়।
আর্জেন্টিনার বিচার মন্ত্রণালয় ২০১৭ সাল থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের হিসাব ব্যাখ্যা চেয়ে এএফএ ও সুপারলিগকে নোটিস দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মামলা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলবে না। ক্রীড়া আইনজীবী অ্যালান ওয়াইল্ডারের ভাষায়, “মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য কেউই বহন করতে চাইবে না।”
মাঠে আর্জেন্টিনা ছন্দে থাকলেও, মাঠের বাইরে এএফএ এখন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি যার পরিণতি এখনও অনিশ্চিত।










