ইরানকে ঠেকানোর সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কায় ইসরায়েল: প্রকট হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র সংকট

গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশল নতুন এক মোড় নিয়েছে। প্রথম দিকে ইসরায়েল তার প্রযুক্তিগত আধিপত্যের দাবি করলেও, ২০২৬ সালের শুরুতে এসে দেশটির নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে এক গভীর উদ্বেগ দানা বেঁধেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরানের সাথে পরবর্তী দফার যুদ্ধে ইসরায়েল নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল ও অপ্রস্তুত থাকতে পারে।
এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ— ইরানের অভাবনীয় ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকায়ন এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরোধক) ক্ষেপণাস্ত্রের চরম সংকট। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পর তেহরান বসে থাকেনি। গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছিল, তা তারা আশাতীত দ্রুতগতিতে কাটিয়ে উঠেছে। বর্তমানে ইরানের হাতে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো, ইরান এখন ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা একযোগে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কৌশলে এগোচ্ছে। তাদের নতুন ‘এতেমাদ’ ও ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং ইসরায়েলি রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার অকার্যকর করতে ইসরায়েলকে যে পরিমাণ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, তার সরবরাহ বর্তমানে নেই।
ইসরায়েলের ‘আয়ন ডোম’, ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ‘অ্যারো’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও এগুলোর এক বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মজুতের এক বিশাল অংশ খরচ করে ফেলেছে। পেন্টাগনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাত্র ৩৭টি থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টর কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একটি বড় যুদ্ধের চাহিদার তুলনায় সামান্য। ইসরায়েল তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য মার্কিন সহায়তার ওপর অতিনির্ভরশীল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারেই টান পড়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষক স্টিভ লেভাটন মনে করেন, মজুত সংকটের কারণে ইসরায়েল হয়তো পরবর্তী যুদ্ধে কেবল আত্মরক্ষার ওপর ভরসা করবে না। যদি তারা বুঝতে পারে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যূহ শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারছে না, তবে তারা যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি বিধ্বংসী হামলা চালানোর নীতি গ্রহণ করবে।
ইরান যখন স্বল্প ব্যয়ে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, তখন ইসরায়েলকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইন্টারসেপ্টর খরচ করতে হচ্ছে। এই অসম ব্যয়ের যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সাল হবে এই অঞ্চলের জন্য অগ্নিপরীক্ষার বছর। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার দ্রুত পূর্ণ করতে না পারে, তবে ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিতে পারে।

-এম. এইচ. মামুন