ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা: চেলসি ছাড়লেন এনজো মারেসকা

পেপ গার্দিওলার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়ে ম্যানচেস্টার সিটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার কথা ক্লাবকে জানানোর পরই চেলসি থেকে আকস্মিক বিদায় নিলেন এনজো মারেসকা। গত মাসে বোর্ডের সঙ্গে মারেসকার সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই চেলসি অনিশ্চয়তায় ভুগছিল। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে গুঞ্জন ছিল যে, ইটালীয় এই কোচ নিজেই সরে যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন। অবশেষে নববর্ষের দিন, বৃহস্পতিবার সকালে তাদের বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। খেলার সময় মারেসকার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ছিল, তবে মাঠের বাইরের আচরণ ছিল আরও বড় সমস্যা। ১৩ ডিসেম্বর এভারটনের বিপক্ষে জয়ের পর ক্লাবে নিজের “সবচেয়ে বাজে ৪৮ ঘণ্টা” কাটানোর রহস্যময় মন্তব্যের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই মন্তব্যের জট এখন খুলেছে-জানা গেছে মারেসকা তার ঊর্ধ্বতনদের (অক্টোবরের শেষের দিকে দুইবার এবং এভারটন ম্যাচের পর) জানিয়েছিলেন যে, মৌসুম শেষে গার্দিওলা সিটি ছাড়লে তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২২-২৩ মৌসুমে মারেসকা ইতিহাদে গার্দিওলার সহকারী ছিলেন।

সূত্র জানিয়েছে , জুভেন্টাস এবং সিটির আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে মারেসকা নতুন চুক্তির জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজে সম্মত হয়েছেন। তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। চেলসি তার এই আবদারে খুশি হতে পারেনি এবং কোনো আলোচনা শুরু করেনি। জানা গেছে, ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করার পর বৃহস্পতিবার সকালে মারেসকা খেলোয়াড় ও স্টাফদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগে চেলসি বর্তমানে পঞ্চম স্থানে আছে এবং শেষ সাত ম্যাচে মাত্র একটি জয় পেয়েছে। রোববার তারা সিটির মুখোমুখি হবে। মারেসকার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে স্ট্রাসবার্গের কোচ লিয়াম রোজেনিয়র এগিয়ে আছেন। স্ট্রাসবার্গ চেলসির পার্টনার ক্লাব।

এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “চেলসি ফুটবল ক্লাব এবং প্রধান কোচ এনজো মারেসকা পারস্পরিক সমঝোতায় আলাদা হয়ে গেছেন। ক্লাবে থাকাকালীন এনজো দলকে উয়েফা কনফারেন্স লিগ এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে সাফল্য এনে দিয়েছেন। এই অর্জনগুলো ক্লাবের সাম্প্রতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে এবং আমরা তার অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানাই।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যোগ্যতা অর্জনসহ চারটি প্রতিযোগিতায় এখনও আমাদের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এনজো এবং ক্লাব বিশ্বাস করে যে, এই পরিবর্তন দলকে আবারও সঠিক পথে ফেরানোর সেরা সুযোগ করে দেবে। আমরা এনজোর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”

কয়েক সপ্তাহের অনিশ্চয়তার পরই মারেসকার এই বিদায়। গত মঙ্গলবার স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে বোর্নমাউথের সাথে ২-২ ড্র করার পর ঘরের দর্শকদের দুয়োধ্বনি শুনতে হয়েছিল তাকে। এভারটন ম্যাচের আগে তিনি যখন বলেছিলেন যে “অনেকে” তাকে সমর্থন করছে না, তখন ক্লাব কর্তৃপক্ষ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। এই মন্তব্যগুলোকে মারেসকার নিজের বিপদ ডেকে আনার শামিল এবং চেলসি প্রজেক্ট নিয়ে তার অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মারেসকা তার অসন্তোষের কারণ ব্যাখ্যা করতে অস্বীকার করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মেডিকেল বিভাগের পরামর্শ উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়কে খেলানোর স্বাধীনতা চেয়েছিলেন তিনি, যা নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। চোট এড়াতে চেলসি কঠোর রোটেশন নীতি মেনে চলে এবং স্পোর্টিং লিডারশিপ টিম কোচকে জানিয়ে দিয়েছিল যে তিনি মেডিকেল বিভাগের ‘রিটার্ন টু প্লে’ প্রোটোকল লঙ্ঘন করতে পারবেন না। এর লক্ষ্য ছিল রিস জেমস, পেদ্রো নেতো এবং ওয়েসলি ফোফানার মতো খেলোয়াড়দের রক্ষা করা, যারা অতীতে চোটে ভুগেছেন। কোল পালমারও এই মৌসুমে কুঁচকির চোটে ভুগছেন এবং সপ্তাহে তিনটি পূর্ণ ম্যাচ খেলার মতো অবস্থায় নেই।

রোটেশনের কারণে খারাপ ফলাফল আসায় বাইরে থেকে সমালোচনার শিকার হয়ে মারেসকার মেজাজ আরও খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল। গত মাসে লিডসের কাছে হারের ম্যাচে তিনি ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন এবং এক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আটলান্টার কাছে হারের ম্যাচেও খেলোয়াড়দের ওপর চাপ কমানোর কথা মাথায় রেখে বদলি করিয়েছিলেন। আটলান্টার কাছে হারের চার দিন পরেই তিনি সেই “বাজে ৪৮ ঘণ্টা”র মন্তব্যটি করেছিলেন।

চেলসি মনে করে, মারেসকা অনেক সময় মেডিকেল বিভাগের ডেটা উপেক্ষা করেছেন। রিস জেমস, যার হাঁটু এবং হ্যামস্ট্রিং সমস্যার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, গত মাসে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি পূর্ণ ম্যাচ খেলেছিলেন—বিষয়টি ভালোভাবে দেখা হয়নি। ২০২৩ সালের পর অধিনায়ক জেমস এমনটা করতে পারেননি।

গার্দিওলার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মারেসকার নাম আসাতেও চেলসি বিরক্ত ছিল। গুঞ্জন আছে যে মারেসকা আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন; কিন্তু চেলসি তাদের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তন করতে রাজি নয়, যেখানে একটি বিশাল রিক্রুটমেন্ট টিম সেরা তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজ করে। মৌসুম শুরুর আগে লেভি কলউইল ইনজুরিতে পড়লে মারেসকা নতুন একজন সেন্টার-ব্যাক চেয়েছিলেন; কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছে, মারেসকার আচরণের প্রভাব দলের পারফরম্যান্সেও পড়েছে। এই মৌসুমে জেতার মতো অবস্থান থেকেও চেলসি ১৫ পয়েন্ট হারিয়েছে, যার ১৩টিই নিজেদের মাঠে। বোর্নমাউথ ম্যাচের পর অসুস্থতার অজুহাতে মারেসকার সংবাদ সম্মেলনে না আসা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। মারেসকার সহকারী উইলি কাবালেরো মিডিয়ার সামনে কথা বললে ক্লাবের ভেতরের অনেকেই অবাক হন। কাবালেরো বলেছিলেন কোচ দুই দিন ধরে অসুস্থ, কিন্তু বুধবার রাতে জানা যায় মারেসকা আসলে প্রেস কনফারেন্স করতে চাননি। চেলসি প্রজেক্ট নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজের বিকল্পগুলো বিবেচনা করছিলেন।

চেলসি চেয়েছিল মৌসুম শেষে মারেসকার অবস্থান পর্যালোচনা করতে। কিন্তু বুধবার রাতে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ২০২২ সালের মে মাসে টড বোয়েলি এবং ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল মালিকানা নেওয়ার পর তারা এখন পঞ্চম স্থায়ী প্রধান কোচের সন্ধানে আছে।

পোর্তোর ম্যানেজার ফ্রান্সেসকো ফারিওলি-সহ বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে এবং চেলসি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়োগ সম্পন্ন করতে চায়। তবে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ম্যাচের জন্য তাদের একজন অন্তর্বর্তীকালীন কোচের প্রয়োজন হতে পারে। রোজেনিয়রকে আনার বিষয়টি নির্ভর করছে স্ট্রাসবার্গ তাঁর উপযুক্ত বিকল্প খুঁজে পায় কি না তার ওপর। মিনেসোটা ইউনাইটেডের ম্যানেজার এরিক রামসের নামও বিবেচনায় রয়েছে।

-অর্ণব